শিশুদের নির্মল আনন্দের মানুষ আখতার হুসেন আর নেই
মজার মজার ছড়া, গল্প ও গান দিয়ে প্রায় ছয় দশক ধরে শিশুদের মন আনন্দে ভরিয়ে রাখা দেশের বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তাঁর দুই ছেলে পান্থ ও প্রমিত তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আখতার হুসেন। সর্বশেষ তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং রক্তচাপ কমে যায়। কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন তিনি। তাঁর সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক ছন্দের ছড়া বহু প্রজন্মের শিশুর শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে। তাঁর লেখা 'হ্যাঁরে খবরটা কী উড়ো'র মতো ছড়া যেমন শিশুদের আনন্দ দিয়েছে, তেমনি তাঁর গল্প ও গানও পাঠক-শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পক্ষে শক্তিশালী মাধ্যম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ও অজিত রায়ের সুরে তিমির নন্দীর গাওয়া 'স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা' গানটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গান হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
আখতার হুসেনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। ছড়া, শিশুসাহিত্য, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে—'সমুদ্র অনেক বড়', 'রামধনুকের সাঁকো', 'উল্টোপাল্টা', 'হালচাল', 'আমার দুটো ডানা', 'ও হাওয়া ও হাওয়া', 'পাজি বেড়ালের শাস্তি', 'ফ্রিডম ফাইটার', 'কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি', 'খেলাঘরের পুতুলগুলো' ও 'ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস'।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের 'শিশু-বিশ্বকোষ'-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতাও করেছেন আখতার হুসেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
সাদাসিধে, হাস্যোজ্জ্বল ও নির্লোভ মানুষ হিসেবে সহকর্মী ও সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল। শিশু, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের তিনি সবসময় উৎসাহিত করতেন।
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে দেশের শিশুসাহিত্য অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তিনি চলে গেলেও তাঁর ছড়া, গল্প, গান ও সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে বহু প্রজন্মের শিশুর কাছে তিনি বেঁচে থাকবেন। তাঁর জানাজা ও দাফনের বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
Comments