লেবাস, পেশি ও লুণ্ঠন: সমকালীন বাংলাদেশের গভীর সাংস্কৃতিক সংকট
যেকোনো সমাজের সংকট যখন কেবল দুটি রাজনৈতিক দল বা দুটি মতাদর্শের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তার সমাধান খুঁজে পাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। রাজনৈতিক সমঝোতা বা আদর্শগত সংস্কারের মধ্য দিয়েই সেই সংকট উত্তরণযোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সংকট আর মতাদর্শিক সংঘাত, ধর্মীয় মেরুকরণ বা ক্ষমতার সমীকরণে আবদ্ধ নেই। এই সংকট সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি রন্ধ্রে বিস্তৃত হয়েছে। এটি কোনো দার্শনিক বিতর্ক নয়, এটি নৈতিকতা ও সুস্থ বোধের ওপর এক বহুমাত্রিক, সর্বগ্রাসী ক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। যে সমাজে সভ্য মূল্যবোধের জায়গা নেয় ভড়ং, হুংকার আর অন্যায্য শক্তি, সেখানে সমাজের মনোজগৎটিই এক দখলদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়।
ভড়ং ও লেবাসের রাজনীতি: শূন্যগর্ভ উচ্চকণ্ঠ
সমকালীন সামাজিক মনস্তত্ত্বের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, বাহ্যিক রূপ আর অভ্যন্তরীণ সত্যের মধ্যে এক গভীর ফাটল তৈরি হয়েছে। সমাজ আজ বেঁচে থাকে প্রচ্ছদ আর লেবাসের ওপর ভর করে। বাইরে মূল্যবোধ, ধর্ম, দেশপ্রেম ও প্রগতির ঝালর ঝুলিয়ে রাখা হয়, অথচ ভেতরে তার সত্যিকার কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট নেই। এই বাহ্যিক প্রদর্শনীই আজ সমাজের প্রধান সামাজিক মূলধনে পরিণত হয়েছে।
যুক্তি ও চিন্তার গভীরতা দিয়ে অবস্থান নির্মাণের বদলে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান হাতিয়ার আজ গলাবাজি আর গালিগালাজ। সামাজিক মাধ্যমে হোক বা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায়, যুক্তির স্থান দখল করেছে চিৎকার আর প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতিযোগিতা। ভাষা যেখানে সত্য প্রকাশের মাধ্যম হওয়ার কথা, তা আজ কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র। সংযম ও রুচি যেখানে সভ্যতার মাপকাঠি ছিল, সেখানে আজ স্থান করে নিয়েছে হুংকার ও তর্জন-গর্জন। যে যত জোরে চিৎকার করতে পারে, যে যত নির্মমভাবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে পারে, সামাজিক মনস্তত্ত্বে সে-ই আজ 'শক্তিশালী' ও 'সফল' বলে বিবেচিত হয়।
মেধার বিদায়, নখ-দাঁতের শাসন
কোনো সমাজ যখন সুস্থ মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সফলতার সংজ্ঞা রাতারাতি পাল্টে যায়। সমকালীন বাংলাদেশে মেধা, মনীষা, কঠোর পরিশ্রম ও সততার আসন দখল করেছে নখ ও দাঁত। অর্থাৎ হিংস্রতা, ধূর্ততা ও অবৈধ শক্তির প্রয়োগ হয়ে উঠেছে সাফল্যের একমাত্র নিয়ামক।
আমাদের অর্জনের ইতিহাস ও বৈভবের দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সাফল্য এসেছে উদ্ভাবন বা মেধার মধ্য দিয়ে নয়, এসেছে দখলের মধ্য দিয়ে। এ এক গভীরভাবে দখলদার মনোজগৎ। নদী-নালা, খাল-বিল, সরকারি জমি বা ফুটপাত দখলের যে সংস্কৃতি আমরা দৃশ্যমান জগতে প্রত্যক্ষ করি, তা প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনোজগতেরই বাহ্যিক প্রতিফলন মাত্র। কীভাবে অন্যকে বঞ্চিত করে, নিয়ম ভেঙে, নিজের স্বার্থ হাসিল করা যায়, এই চিন্তাই আজ প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই সামাজিক কাঠামোয় সম্পদের হিসাব হয় কেবল সংখ্যা আর পেশির দাপটে। কার কত টাকা, কার পেছনে কত সশস্ত্র বা সহিংস সমর্থক, তা দিয়েই নির্ধারিত হয় ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা। সেই সম্পদ অবৈধ পথে অর্জিত কি না, সেই ক্ষমতার পেছনে কোনো নৈতিক ভিত্তি আছে কি না, তা নিয়ে সমাজের কোনো ভ্রূকুটি নেই। মেধা ও সততাকে সম্মান জানানোর বদলে সমাজ আজ নতজানু হয় লুণ্ঠনকারী ও পেশিশক্তির সামনে। সাফল্যের এই বিকৃত রূপ পুরো তরুণ প্রজন্মকে এক বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে - মেধাচর্চা নিরর্থক, টিকে থাকতে ও জিততে হলে কেবল নখ-দাঁত শাণিত করতে হবে।
ঘৃণা ও রক্তের স্রোতে রচিত 'সফলতা'
আমাদের সামাজিক সংহতি আজ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে নয়, আমাদের ঐক্য আজ গড়ে ওঠে ঘৃণাকে কেন্দ্র করে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, মত বা ব্যক্তিকে ঘৃণা করার মধ্য দিয়েই আমরা দলবদ্ধ হই।
রাজনৈতিক বা সামাজিক জয় আজ আর কোনো ইতিবাচক রূপান্তরের বার্তা বহন করে না; তা অর্জিত হয় রক্তপাত, প্রতিহিংসা ও ধ্বংসের ওপর ভর করে। ইতিহাস সাক্ষী, যে সমাজ কেবল ঘৃণা আর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সাফল্য নির্মাণ করতে চায়, তার চূড়ান্ত পরিণতি আত্মধ্বংস। সহিংসতার এই চক্র একবার সক্রিয় হলে তা কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, পুরো সমাজকে ঠেলে দেয় অনন্ত প্রতিহিংসার দিকে। আমরা এক এমন সংস্কৃতি নির্মাণ করেছি, যেখানে অন্যের পতন বা কষ্টই হয়ে উঠেছে আমাদের পরম আনন্দের উৎস।
ছিটকে পড়াদের দীর্ঘশ্বাস: বেঁচে থাকার বিকৃত রূপ
এই সর্বগ্রাসী, লুণ্ঠনমুখী পরিবেশে সবচেয়ে বিপন্ন তারা, যারা নিজেদের বিবেক, রুচি ও নীতিবোধ ধরে রাখতে চেয়েছেন। যারা নখ-দাঁতের লড়াইয়ে নামতে অনিচ্ছুক, যারা অন্যের অধিকার হরণ করে 'সফল' হতে চান না, এই সমাজ তাঁদের একপাশে ঠেলে দিয়েছে। তাঁরা আজ এই সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ প্রান্তিক, অপ্রাসঙ্গিক মানুষ।
এই প্রান্তিক মানুষগুলোর বেঁচে থাকা আজ এক নিরন্তর যন্ত্রণার নাম। প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে তাঁদের মুখোমুখি হতে হয় অবিচার, অপমান আর অবহেলার। নীতি আঁকড়ে ধরে থাকার মূল্য তাঁদের প্রতিনিয়ত চোকাতে হয়। তাঁদের অস্তিত্ব আর স্বাভাবিক, বিকশিত জীবন নয়, তা যেন শরীরে ও মনে নিরন্তর আঘাত সয়ে বেঁচে থাকার এক প্রস্তুতি।
প্রতিদিন সকালে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার লড়াই, নিজের সন্তানকে এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রভাব থেকে রক্ষা করার লড়াই, চারপাশের মিথ্যা ও ভণ্ডামির মধ্যেও নিজের ভেতরের সততা টিকিয়ে রাখার লড়াইএসব লড়াই মানুষকে ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত করে তোলে। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ বা আনন্দময় জীবন নয়; এটি বেঁচে থাকার এক চরম ট্র্যাজিক রূপ, যেখানে মানুষ কেবল শ্বাস নেওয়ার তাগিদে বেঁচে থাকে, অথচ তার আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে।
পচনের গভীরতা ও উত্তরণের অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশের এই সংকটকে কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে দেখা হলে তা ভুল বিশ্লেষণ হবে। এই সংকট সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম থেকে পরিবার—সর্বত্র এই ক্ষয়ের ছায়া পড়েছে। শিক্ষা আজ আর আলোকপ্রাপ্তির মাধ্যম নয়, তা নিছক সনদ অর্জনের উপায়ে পর্যবসিত হয়েছে। পরিবার আজ আর নীতিশিক্ষার প্রথম পাঠশালা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা শেখায় যেকোনো মূল্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল।
যে সমাজ মেধা-মনীষার বদলে নখ-দাঁতের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার ভবিষ্যৎ গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। অবৈধ পথে অর্জিত সাফল্য যখন সর্বজনীন স্বীকৃতি পায়, তখন সততার আর কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না।
এই সর্বগ্রাসী পচন থেকে উত্তরণের পথ দীর্ঘ ও কঠিন। কেবল ক্ষমতার রদবদল বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণ, নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে 'সফলতা' ও 'শক্তি'র অর্থ। পেশির দাপট নয়, মেধা ও রুচির মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে। লেবাস ও প্রচ্ছদের ভণ্ডামি উন্মোচিত করে সত্য ও সৌন্দর্যের চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে।
যতদিন না আমরা এই দখলদার মনোজগৎ ও নখ-দাঁতের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে পারছি, ততদিন প্রান্তিক মানুষগুলোর রক্তক্ষরণ থামবে না। আর যে সমাজ তার সত্যনিষ্ঠ, নীতিবান ও রুচিশীল মানুষদের প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত করে, সেই সমাজ বাহ্যিক চাকচিক্য সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণভাবে এক মৃত, আত্মাহীন কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হতে বাধ্য।
Comments