বাংলাদেশে কেন খুচরা ব্যাংকিং বিক্রি করে দিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড?
দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আস্থা কমে যাওয়ার কারণেই কি তবে বাংলাদেশের খুচরা ব্যাংকিং (রিটেইল) ব্যবসা ও ক্রেডিট কার্ড সেবা বিক্রি করে দিচ্ছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড? এমন একটি প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে।
১৭৩ বছরের পুরোনো এই ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং খাতে আমানত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি সাদিক ইসলামিক ব্যাংকিং সেবাও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সেবা। ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং সেবার মধ্যে রয়েছে স্মার্ট ও চলতি হিসাব, স্থায়ী ও বৈদেশিক মুদ্রা আমানত, প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ড–ভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড, জামানতবিহীন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পার্সোনাল লোন, গাড়ি কিনতে অটো লোন এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের সুবিধা। ইসলামিক শরিয়াহ নীতি মেনে পরিচালিত 'স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক' সেবার আওতায় রয়েছে সুদবিহীন ডিপিএস, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা। এ ছাড়া অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আছে বিশেষায়িত 'স্বদেশী ব্যাংকিং' সেবা, যার মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে সঞ্চয় ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।
এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে আর্থিক খাতে। অনেকেই বিষয়টিকে দেখছেন দেশের শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর ব্যাংকটির আস্থার অভাব হিসেবে। চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। জানা গেছে, একটি বিদেশি ব্যাংক হিসেবে এ দেশে খুচরা ব্যাংকিং পরিচালনা করা এবং কমপ্লায়েন্স বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত নিয়মনীতি মেনে চলার খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। তুলনামূলকভাবে ছোট বাজারে সাধারণ গ্রাহকপর্যায়ের খুচরা ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা পরিচালনা করা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক। আর সে জন্যই এই সিদ্ধান্ত। সাধারণ গ্রাহকদের ছোট আমানত বা ঋণের বদলে ব্যাংকটি এখন বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও করপোরেট ক্লায়েন্ট এবং ধনী গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবায় আরও বেশি জোর দিতে আগ্রহী।
এরকম কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে কনজ্যুমার, প্রাইভেট ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রাখে। পরে শ্রীলঙ্কায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দেয়।
এর মধ্যেই দেশের কয়েকটি ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার অংশ অধিগ্রহণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক অধিগ্রহণের দৌড়ে এগিয়ে আছে। তাদের সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এ নিয়ে পৃথক সভাও হয়েছে। ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। ইতিমধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে এ নিয়ে পৃথক সভা করেছে তারা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করেও বিষয়টি অবহিত করে গেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বহুজাতিক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)। এরও আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক। অনেকের শঙ্কা—তবে কি সে পথেই হাঁটছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক?
Comments