বিপিসির লোকসান বনাম জনগণের বোঝা: তেলের চড়া দামে দিশেহারা দেশ
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে আবার নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ডলার সংকট ও রিজার্ভের ওপর টানাপোড়েনের মধ্যেই ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে জরুরি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
সহকারী সচিবের স্বাক্ষরে জারি করা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকেই ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে কার্যকর করা হয়েছে।
সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে—আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রাখা, বিপিসির দৈনিক লোকসান আটকানো আর আইএমএফের ঋণের শর্ত মানতেই নাকি এই পদক্ষেপ ছাড়া গতি ছিল না। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই দরবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পকেটে সরাসরি টান ফেলেছে।
নতুন দর ও প্রজ্ঞাপনের হিসাব-নিকাশ
সরকারি প্রজ্ঞাপন ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নতুন দাম:
ডিজেল: আগে লিটারপ্রতি ছিল ১১৫ টাকা। ২০ টাকা বেড়ে এখন দাঁড়াল ১৩৫ টাকায় (বাড়ল ১৭.৩৯%)।
কেরোসিন: আগে ছিল ১৩৫ টাকা। ২০ টাকা বেড়ে নতুন দর ১৫৫ টাকা (বাড়ল ১৪.৮১%)।
পেট্রোল: আগে ছিল ১৪০ টাকা। ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা (বাড়ল ১৪.২৯%)।
অকটেন: আগে ছিল ১৪৫ টাকা। ২০ টাকা বেড়ে নতুন দর ১৬৫ টাকা (বাড়ল ১৩.৭৯%)।
কেন এই সিদ্ধান্ত? পেছনে ডলার সংকট ও বৈশ্বিক চাপ।
বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন দৈনিকে যে কারণগুলো উঠে এসেছে:
বিপিসির বিপুল লোকসান: চলতি ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসেই বিপিসির ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। দাম বাড়ানোর আগপর্যন্ত শুধু ডিজেলেই লিটারে সংস্থাটির লোকসান হচ্ছিল প্রায় ৮৯ টাকা, যার দরুন দৈনিক ক্ষতি হচ্ছিল পৌনে ১০৯ কোটি টাকা। লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর বছরে লোকসান অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে আশা করছে সরকার।
আইএমএফের শর্ত ও মূল্যের ওঠানামা: আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি পেতে জ্বালানি খাত থেকে সরকারি ভর্তুকি তুলে দেওয়ার চাপ রয়েছে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে স্বয়ংক্রিয় দাম সমন্বয়ের যে পদ্ধতি চালু হয়েছে, তাতে বিশ্ববাজারে দাম একটু বাড়লেই দেশে লাফিয়ে বাড়ে, কিন্তু বিশ্ববাজারে কমলে তার সুফল দেশের সাধারণ গ্রাহক খুব একটা পান না।
ডলার সংকট ও ঋণপত্র (LC) জটিলতা: শুধু বিপিসির আর্থিক ক্ষতিই নয়, দেশে ডলারের টানা টানাটানির কারণে তেলের জন্য সময়মতো এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশি সরবরাহকারীদের পাওনা মেটাতে তেলের দাম বাড়িয়ে দ্রুত হাতে নগদ টাকা তোলাই ছিল সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
সীমান্তে পাচারের ভয়: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ডিজেলের দাম যেখানে লিটারপ্রতি প্রায় ৯২-৯৩ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় ১৩৪-১৩৫ টাকা) এবং নেপালে ১৬১ টাকার বেশি, সেখানে দেশে দাম কম থাকলে সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়—এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছে।
কার পকেট কত খালি হচ্ছে: খাতভিত্তিক খতিয়ান
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশই হলো ডিজেল। আর পেট্রোল-অকটেন মিলিয়ে মাত্র ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ, বাকিটা কেরোসিন। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে তার রেশ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ (প্রায় ৮-৯ কোটি): অনানুষ্ঠানিক খাতের সাড়ে ৫ কোটি শ্রমিক এবং দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা প্রায় ৪ কোটি মানুষ সরাসরি বাইক বা গাড়ি না চালালেও ডিজেলচালিত বাস-ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি ও নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন এরা।
কৃষক সমাজ (প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ): দেশের প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ সেচ পাম্প চলে ডিজেলে। সামনে বোরো ও চলমান সেচ মৌসুমে সেচ ও যান্ত্রিক চাষের খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে, যা প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াবে এবং ধানের দামে প্রভাব ফেলবে।
ডিজিটাল কমার্স ও লজিস্টিকস খাত: দেশে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত এক লাখের বেশি ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও পার্সেল ডেলিভারি লজিস্টিকস উদ্যোগ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের মুখে পড়েছে।
রপ্তানিমুখী পোশাক ও শিল্প কারখানা: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিয়মিত সংকটের কারণে কারখানা চালু রাখতে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হয়। ডিজেল ১৭.৩৯% মহার্ঘ হওয়ায় পোশাকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেবে।
কেরোসিননির্ভর গ্রামের পরিবার (প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ): চরাঞ্চল ও বিদ্যুৎহীন গ্রামের মানুষ রান্নাবান্না ও আলোর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় বাড়তি আর্থিক ধাক্কায় পড়েছেন।
গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন:
ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফার্ম (DCRAF)-এর পর্যবেক্ষণ:
অনলাইন বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কর্মরত গবেষণা প্রতিষ্ঠান DCRAF তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, এক লাফে ২০ টাকা তেলের দাম বাড়ায় শেষ ধাপের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার খরচ (Last-mile delivery cost) ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এতে ই-কমার্স খাতের ছোট ও মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তাদের (MSME) টিকে থাকা কঠিন হবে এবং শেষমেশ পণ্য ডেলিভারির বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপরই গিয়ে চাপবে।
সিপিডি ও বিআইডিএসের বক্তব্য:
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বিআইডিএসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এমনিতেই মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন সময়ে ডিজেলের দাম ১৭.৩৯% বাড়ানো সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর খরচ এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দেবে। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জমানো টাকা শেষ হবে এবং নতুন করে বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে।
বিপিসির আগের ৪৯ হাজার কোটি টাকার লাভ।
অডিট রিপোর্ট ও বিগত বছরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম থাকায় বিপিসি নিট লাভ করেছে প্রায় ৪৮,৮১৬ কোটি টাকা।
গত এক দশকে সংরক্ষিত এই বিপুল তহবিল থেকে সংকটকালে সাধারণ মানুষকে সামান্য ছাড় না দিয়ে, এক লাফে জনগণের ওপর প্রতি লিটারে ২০ টাকার পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
বিকল্প পথ কী হতে পারত?
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই চাপ কিছুটা কমানো যেত যদি:
১. বিলাসদ্রব্য ও ব্যক্তিগত গাড়ির অকটেন-পেট্রোলের দাম বেশি বাড়িয়ে ডিজেল ও কেরোসিনে কিছুটা ভর্তুকি বজায় রাখা যেত।
২. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তেল আমদানির ওপর বসানো ভ্যাট ও শুল্ক সাময়িকভাবে কিছুটা ছাড় দিত।
৩. একবারে লিটারে ২০ টাকা না বাড়িয়ে মাসে মাসে ২-৩ টাকা করে সমন্বয় করা হতো।
সরকারি খাতায় লোকসান কমানোর গাণিতিক হিসাব মিললেও, এভাবে হুট করে ডিজেলের মতো জরুরি জ্বালানির দাম বাড়ানো পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৃষি, পরিবহন আর অনলাইন বাণিজ্যের মতো খাতগুলোতে বিশেষ নজর না দিলে এবং বাজারে সঠিক তদারকি না থাকলে, তেলের এই উচ্চ দর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
Comments