জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও করের বোঝা: জনগণের স্বস্তি বনাম রাজস্বের হিসাব
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান অর্থনীতিতে অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি খাতের নানা হিসাব-নিকাশ বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—তেলের মূল্যের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সরকারের আরোপিত নানা ধরনের কর ও শুল্ক। উদাহরণস্বরূপ, ডিজেল আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট, কাস্টমস ডিউটি, অগ্রিম কর এবং অগ্রিম আয়কর মিলিয়ে প্রায় ৩১.৮৫ শতাংশ রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়। সহজ অঙ্কে, ডিজেলের দর ১০০ টাকা হলে তার প্রায় ৩২ টাকাই জমা হয় সরকারি তহবিলে। যেখানে এককভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর, ৬ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জ্বালানি খাতের এ ধরনের উচ্চ কর কাঠামো সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। সরকারের এই রাজস্ব সংগ্রহের নীতি এবং আমজনতার ওপর তার প্রভাব বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে:
কর ছাড়ের সুযোগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ জ্বালানি তেল কোনো বিলাসবহুল পণ্য নয়; এটি কৃষি, পরিবহন ও উৎপাদন খাতের প্রাথমিক জ্বালানি। উচ্চ কর হারের কারণে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজারমূল্য এক লাফেই বেড়ে যায়। সরকার যদি এই ৩১.৮৫ শতাংশ করের বোঝা কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নিত, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সত্ত্বেও দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়াতে হতো না। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমত এবং সাধারণ জনগণকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কষাঘাত সইতে হতো না।
রাজস্বের তাগিদ ও সরকারের অগ্রাধিকার নীতিগতভাবে কর ছাড় না দেওয়ার প্রধান কারণ সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। রাষ্ট্রের পরিচালনা ব্যয়, সরকারি খাতের বেতন-ভাতা প্রদান এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক অবকাঠামো ও মেগাপ্রকল্পের বিশাল বাজেট বজায় রাখতে নিয়মিত ও নিশ্চিত রাজস্বের প্রয়োজন হয়। পরোক্ষ কর হিসেবে জ্বালানি তেল থেকে রাজস্ব আদায় করা সবচেয়ে সহজ ও নিশ্চিত পথ। ফলে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার জ্বালানির কর ছাড়ের বিষয়টি এড়িয়ে চলে।
অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও জনস্বার্থের প্রশ্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি পরিচালন ব্যয়ের গুরুত্ব থাকলেও, তার জোগান দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করা কতটুকু যৌক্তিক, সেটিই মূল প্রশ্ন। জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আদায়ের কৌশল সাময়িকভাবে রাজস্ব বাড়ালেও, সার্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দেয়। মেগাপ্রকল্প বা বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত ক্রয়ের চেয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক বেশি জরুরি।
আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত না দিয়ে ডিজেলের বিদ্যমান শুল্ক ও কর কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি। করের হার খানিকটা কমিয়ে এনে জনগণকে মূল্যস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করা এবং একই সাথে বিপিসিকে সচল রাখা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির লক্ষণ। উন্নয়ন কেবল বড় অবকাঠামোয় নয়, সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার স্বস্তিতেই পরিলক্ষিত হওয়া উচিত।
Comments