সম্পত্তি দান, ভোগাধিকার ও বয়স্ক মা-বাবার সুরক্ষা
বৃদ্ধ মা-বাবার জীবনের শেষ সময়টুকু নিরাপদ ও সম্মানজনক হওয়া একটি সভ্য সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অথচ আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এমন ঘটনাও কম নয়, যেখানে সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর সেই মা-বাবাকেই অবহেলা, অনাদর কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা বেছে নিতে হয়েছে। কারও পেনশনের টাকা সন্তান নিয়ে নিচ্ছেন, কারও জীবনের সঞ্চয় ও বসতভিটা সন্তান নিজের নামে করে নিচ্ছেন, আবার কেউ সম্পত্তি হস্তান্তরের পরই হয়ে পড়ছেন পরিবারের বোঝা। এই বাস্তবতায় নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে দাতার আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ।
সদ্য পাস হওয়া 'সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন'-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—কেউ সম্পত্তি দান করলেও দাতা তাঁর জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হলেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে। বিশেষ করে বয়স্ক মা-বাবার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা হতে পারে।
বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতির বিধান থাকলেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান ছিল না। নতুন ১২২(ক) ধারা সেই জায়গাটিই পূরণ করছে। এর আওতায় বাবা-মা সন্তানকে, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে, সন্তান বা নাতি-নাতনি তাঁদের পূর্ববর্তী প্রজন্মকে এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে এ ধরনের সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এই ব্যবস্থা শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য নয়; সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হবে। আমাদের মতো বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে এই সর্বজনীনতা আইনটির অন্যতম শক্তিশালী দিক।
মুসলিম আইনে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে 'হেবা'র একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন আইনটি সেই ব্যবস্থাকে বাতিল বা সংকুচিত করছে না। বরং এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র আইনি পথ তৈরি করছে। ফলে কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করে হেবা করতে চাইলে তা করতে পারবেন; আবার কেউ সংশোধিত আইনের অধীনে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করতে চাইলে সেই সুযোগও পাবেন। এ দুটি ব্যবস্থাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে বিকল্প আইনি পথ হিসেবে দেখা উচিত।
আইনটির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও দান করা সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। তবে দাতা যে জীবনকালীন ভোগাধিকার নিজের কাছে রেখেছিলেন, সেটিও বহাল থাকবে। অর্থাৎ মালিকানা এবং ভোগের অধিকারকে আলাদা করে দেখার একটি আইনি কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
এটি শুধু বাবা-মায়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; নারীর জন্যও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আমাদের সমাজে বহু নারী তাঁদের সন্তান বা স্বামীর ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর কোনো নারী যদি সম্পূর্ণভাবে সন্তানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। নতুন ব্যবস্থায় অন্তত সম্পত্তি ভোগের অধিকারটি নিজের কাছে রাখার সুযোগ তাঁকে কিছুটা আইনি নিরাপত্তা দিতে পারে।
তবে আইন পাস করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। আইনটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর প্রয়োগের ওপর। একজন বয়স্ক মা বা বাবা কীভাবে তাঁর ভোগাধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করবেন, সন্তান যদি সেই অধিকারে বাধা দেন তাহলে দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার পথ কী হবে, স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।
Comments