বুলবুল আহমেদ স্মরণে: ব্যাংকের ম্যানেজার থেকে চলচ্চিত্রের মহানায়ক
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের অভিনয় প্রতিভা ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন অভিনেতা বুলবুল আহমেদ। রুপালি পর্দায় 'মহানায়ক' হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তির আজ জন্মদিন। ১৯৩৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার আগামসি লেনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার প্রকৃত নাম ছিল তাবাররুক আহমেদ। বাবা খলিল আহমেদ ও মায়ের অষ্টম সন্তান ছিলেন তিনি। পরিবারের আদরে ছোটবেলা থেকেই 'বুলবুল' নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
অভিনয়ের পরিবেশেই অনেকটা বেড়ে উঠেছিলেন বুলবুল আহমেদ। তার বাবা খলিল আহমেদ পাকিস্তানের অর্থ বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাট্যকার ও অভিনেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। পুরান ঢাকার তাদের বাড়িতে নিয়মিত নাটকের মহড়া হতো। সেই সময়ের বহু গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য ও অভিনয় কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান বুলবুল। বাবার নির্দেশনায় মাহবুব আলী ইনস্টিটিউশনে নাটক দেখার মধ্য দিয়ে অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চিরকুমার সভা' নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন বুলবুল আহমেদ। তৎকালীন ইউবিএল ব্যাংকের টিএসসি শাখায় প্রায় এক দশক ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে ব্যাংকের ব্যস্ত পেশাজীবনের পাশাপাশি অভিনয় থেকেও নিজেকে দূরে রাখেননি।
১৯৬৪ সালে আবদুল্লাহ আল মামুনের 'বরফ গলা নদী' নাটকের মধ্য দিয়ে টেলিভিশনে তার অভিনয়জীবনের সূচনা হয়। এরপর 'মালঞ্চ', 'মাল্যদান', 'বড়দিদি', 'আরেক ফাল্গুন', 'শেষ বিকেলের মেয়ে' এবং দস্তয়েভস্কির উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত 'ইডিয়েট'-এর মতো নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি আবৃত্তি ও উপস্থাপনাতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ রাখেন তিনি।
অভিনয়ের প্রতি গভীর টান থেকেই শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বুলবুল আহমেদ। ১৯৭২ সালে পরিচালক আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের অনুপ্রেরণায় ব্যাংকিং পেশা থেকে সরে এসে পুরোপুরি চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করেন। পরের বছর 'ইয়ে করে বিয়ে' সিনেমায় নায়ক হিসেবে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার।
এরপর একের পর এক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। 'অঙ্গীকার', 'ধীরে বহে মেঘনা', 'রূপালী সৈকতে', 'সীমানা পেরিয়ে', 'সূর্য কন্যা' এবং 'জন্ম থেকে জ্বলছি'র মতো সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।
তবে তার অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক হয়ে আছে 'দেবদাস'। ১৯৮৭ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্র দেবদাসের ভূমিকায় অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। চরিত্রটির আবেগ, যন্ত্রণা ও দ্বন্দ্বকে পর্দায় যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় অভিনেতার মর্যাদা এনে দেয়।
শুধু অভিনয় নয়, নির্মাতা হিসেবেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বুলবুল আহমেদ। পরিচালনা ও প্রযোজনায় তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে 'ওয়াদা', 'মহানায়ক', 'ভালো মানুষ', 'রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত', 'আকর্ষণ', 'গরম হাওয়া' ও 'কত যে আপন'।
প্রায় ৪৪ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বুলবুল আহমেদ প্রায় ৩০০টি টেলিভিশন নাটক ও দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল 'দুই নয়নের আলো'। ২০০৯ সালে নির্মিত 'বাবার বাড়ি' ছিল তার অভিনয় ও পরিচালনায় শেষ টেলিভিশন নাটক।
অভিনয়শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন বুলবুল আহমেদ। পাশাপাশি বাচসাস পুরস্কারসহ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা।
ব্যাংকের একজন সফল কর্মকর্তা থেকে অভিনয়ের জগতে এসে বুলবুল আহমেদ যে উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল। তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতা আজও দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
Comments