নিষেধাজ্ঞা শেষে কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণ শুরু
দীর্ঘ ৩ মাস ১৫ দিন পর রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও শুরু হয়েছে মৎস্য আহরণ। দীর্ঘদিন পর মাছ নিয়ে জেলেদের বোট ভিড়তে শুরু করায় কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও ঘাট শ্রমিকদের মধ্যে।
সোমবার (১০ আগস্ট) মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার পর মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে রাঙামাটির ফিসারী ঘাট ও কাপ্তাইয়ের জেটিঘাটে অবস্থিত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৬টা থেকে কাপ্তাই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকা, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, বিলাইছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইঞ্জিনচালিত বোটে করে জেলেরা নানা প্রজাতির মাছ নিয়ে আসতে থাকেন। সারি সারি বোটে চাপিলা, কাচকি, টেংরা, আইড়, বাইম, বাচা, কালিগুনিয়া, পাবদাসহ বিভিন্ন জাতের মাছের ড্রাম নিয়ে ঘাটে ভিড় করতে দেখা যায়।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা শুল্ক পরিশোধের পর মাছগুলো বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ বিরতির পর জেলে, ব্যবসায়ী ও ঘাট শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি যেন ফিরে পেয়েছে পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য।
কাপ্তাইয়ের মৎস্য ব্যবসায়ী জিয়াউল হক জিয়া, সাজ্জাদ, মো. মাইনুদ্দীন এবং ঘাট শ্রমিক আজগর আলীসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা ইঞ্জিনচালিত বোটে করে মাছ নিয়ে আসছেন। প্রথম দিন কাচকি, চাপিলা, টেংরা, বাচা, আইড়, কালিগুনিয়া, পাবদা ও বাইম মাছ বেশি ধরা পড়েছে। লেকের পানি কমে এলে ধীরে ধীরে বড় আকারের মাছও বেশি ধরা পড়বে বলে তারা জানান।
তারা আরও জানান, কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত এসব মাছ চট্টগ্রাম, ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে,কাপ্তাই মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বেলাল হোসেন, সহ-সভাপতি আলতাফ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নবী হোসেন জানান, দীর্ঘ ৩ মাস ১৫ দিন পর নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু হয়েছে। রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মাইনি, বরকলের শুভলং, বিলাইছড়ির গাছকাটা ছড়া, রাইংখং খালসহ হ্রদের বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা মাছ ধরে কাপ্তাই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। এসব মাছের শুল্ক পরিশোধের পর চট্টগ্রাম, ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা শেষে হ্রদ উন্মুক্ত হওয়ায় মাছ আহরণের অপেক্ষায় থাকা জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও হ্রদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হ্রদে মাছ শিকার শুরু হলে স্থানীয় বাজারে দেশীয় মাছের সরবরাহ বাড়বে। এতে জেলে ও ব্যবসায়ীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সাধারণ ভোক্তারাও সুফল পাবেন।
কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার। কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
হ্রদের বিশাল জলরাশি রাঙামাটির অর্থনীতি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় মাছ আহরণ বন্ধ রেখে প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরে নির্ধারিত নিয়ম মেনে মাছ শিকার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে এ মৎস্যসম্পদ টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, কাপ্তাই জেটিঘাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রথম দিনেই ২৮ হাজার ৮৬৬ কেজি মাছ অবতরণ হয়েছে।
রাঙামাটির কাপ্তাই মৎস্য উন্নয়ন উপকেন্দ্রের প্রধান জসিম উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে কাপ্তাই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছ অবতরণ শুরু হয়। এদিন বেলা ১টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রে ২৮ হাজার ৮৬৬ কেজি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ অবতরণ হয়েছে। এসব মাছের বিপরীতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
এদিকে, রাঙামাটি ফিসারী ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, মঙ্গলবারের আগের দিন এখানকার আবহাওয়া কিছুটা খারাপ ছিল। তাই অনেকেই হ্রদে জাল ফেলতে পারেননি। এ কারণে এখনো মাছের আকার সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, হ্রদে মাছ আহরণের প্রথম দিকে মাছের আকার কিছুটা ছোট থাকে। পরে বড় আকারের মাছ পাওয়া যায়। মৎস্য ব্যবসায়ী শাহজাহান আরও বলেন, মঙ্গলবার রাঙামাটি ফিসারী ঘাটে কাচকি, চাপিলা, আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আসছে।
রাঙামাটি ফিসারী ঘাটের আরেক মাছ ব্যবসায়ী মো. করিম বলেন, প্রথম দিনেই প্রচুর মাছ ঘাটে এসেছে। তবে মাছের আকার অনেকটা ছোট। তিনি বলেন, আজকের ঘাটে কাচকি মাছের চেয়ে চাপিলা মাছ বেশি জালে ধরা পড়েছে।
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপক কমান্ডার মোহাম্মদ ফয়েজ আল করিম বলেন, প্রায় সাড়ে ৩ মাস পর আজ থেকে মৎস্য আহরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দিন হিসেবে দুপুর পর্যন্ত তাদের অবতরণ ঘাটে প্রচুর পরিমাণে মাছ আসছে।
তিনি বলেন, চাপিলা মাছের আকার নিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ীরা একটু চিন্তিত হতে পারেন। তবে তিনি আশা করছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন পর মাছের আকার আরও বড় হবে। যদিও এ বছর আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল ছিল। ঝড় ও বন্যার কারণেও পরিস্থিতি কিছুটা প্রভাবিত হয়েছে।
কমান্ডার মোহাম্মদ ফয়েজ আল করিম বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মৎস্য আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ১০ হাজার মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়েছে। এতে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গতবারের মতো এবারও পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি বছর ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত তিন মাসের জন্য মাছ আহরণ, বাজারজাত ও পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। পরে হ্রদের পানির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও ১০ দিন বাড়িয়ে ১০ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সোমবার মধ্যরাত থেকে পুনরায় কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসের অপেক্ষার পর আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ফিরেছে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্যনির্ভর জনপদ।
Comments