নদীর করাল গ্রাসে বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের মানচিত্র, আতঙ্কে হাজারো পরিবার
মেঘ দেখলেই আতঙ্কে নদীর পাড়ে ছুটে আসেন ৮০ বছরের বুরুজান বিবি। কয়েক বছরের ব্যবধানে কঁচা নদী এগিয়ে এসেছে তার বসতঘরের কিনারায়। একসময় ছিল জমিজমা, ঘরবাড়ি আর সংসার; নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন শেষ সম্বল একটি ঘর। বর্ষায় সেই ঘরটুকুও নদীগর্ভে চলে যাবে কি না, সেই শঙ্কায় দিন কাটছে বৃদ্ধার। শুধু বুরুজান বিবি নন, কঁচা, বলেশ্বর, সন্ধ্যা ও কালিগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙনে পিরোজপুরের নদীতীরবর্তী হাজারো পরিবার এখন একই আতঙ্কে দিন পার করছেন।
বছরের পর বছর ভাঙছে, বদলে যাচ্ছে মানচিত্র। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে ভয়াবহ রূপ নেয় পিরোজপুরের নদীভাঙন। কঁচা বলেশ্বর, কালিগঙ্গা ও সন্ধ্যা নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক, বাজারসহ নানা স্থাপনা।
ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক গ্রাম ও জনপদ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। নদীভাঙনের কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই পেয়েছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে চলে গেছেন অন্যত্র।
পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী, কৈবর্তখালী, টোনা, হুলারহাট, দেওনাখালি, বানেশ্বরপুর, কুমিরমড়া, শারিকতলা ও বেকুটিয়া ফেরিঘাট; নেছারাবাদের ছারছিনা; কাউখালীর আমড়াঝুড়ি ফেরিঘাট, সোনাকুর, হোগলা, বেতকা, সয়না, রঘুনাথপুর, রোঙ্গাকাঠী ও গন্ধর্ব; মঠবাড়িয়ার খেতাচিরা, মাঝেরচর এবং জিয়ানগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো মানুষ। কালিগঙ্গার ভাঙনে হুমকিতে পাঁচ হাজার মানুষ।
এদিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার টোনা ইউনিয়নের চরলখাকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলিন হওয়ার পথে। এই বিদ্যালয়ের পাশ থেকে বয়ে গেলে প্রমত্তা কঁচা নদী। ইতিমধ্যেই স্কুলটির মাঠ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয় সুজন হাওলাদার জানান, এলাকার শিশুদের জন্য একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদী ভাঙনের কবলে পড়ছে। ইতিমধ্যেই বিদ্যালয়টি অন্য জায়গায় পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পিরোজপুর সদর ও নাজিরপুর উপজেলার দুর্গাপুর, কলাখালী ও শ্রীরামকাঠি ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালিগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে কয়েক বছর ধরে তীব্র ভাঙন চলছে। দক্ষিণে কঁচা নদী, উত্তরে বেলুয়া নদী আর মাঝখানে কালিগঙ্গা। এই কালিগঙ্গাই পশ্চিমে নাজিরপুর ও পূর্বে স্বরূপকাঠি উপজেলাকে বিভক্ত করেছে। নদীর পূর্বপাড়ে চর জেগে উঠলেও পশ্চিম পাড়ে শ্রীরামকাঠি দক্ষিণ বাজার থেকে চলিশা-জীবগ্রাম হয়ে সাবেকডাঙা পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গত দুই বছরের তুলনায় চলতি বছর ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কালিগঙ্গার ভাঙনে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে একমাত্র চলাচলের সড়ক, ৮৭ নম্বর চলিশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় নাজমুল ইসলাম বলেন, "প্রতিবছর প্রায় একশ পরিবার এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমরা আজ ভূমীহীনের তালিকায়। নদীর পাড়ে যারা বসবাস করছি, তাদের জন্য বেড়িবাঁধ দিয়ে যেটুকু আছে, সেটুকু যেন রক্ষা করা হয়।"
বাদশা ফকির বলেন, বাবলা খালের মাথা থেকে শ্রীরামকাঠি পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় নদীভাঙনে বহু মানুষের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েকশ বিঘা সম্পত্তি ইতোমধ্যে নদীতে চলে গেছে।
এদিকে ৩০ বছর ধরে ভাঙছে সন্ধ্যা নদী কাউখালী উপজেলার পশ্চিম পাড়েও দীর্ঘদিন ধরে চলছে সন্ধ্যা নদীর ভাঙন। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৩০-৩২ বছর ধরে সোনাকুর, হোগলা, বেতকা, সয়না, রঘুনাথপুর, রোঙ্গাকাঠী ও গন্ধর্ব এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
সোনাকুরের পালবাড়ি ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পও এখন অস্তিত্বের সংকটে। একসময় যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মানুষের কোলাহল, সেখানে এখন নদীর জলরাশি।
ভাঙনকবলিত সুমন কুন্ডু বলেন, "সামনে দুই বিঘা জমি ছিল, তা রাক্ষুসে নদীতে লইয়া গেছে। এখন যা আছে, তাও কবে নদীতে চলে যায় সেই চিন্তায় থাকি।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ তিন দশক ধরে নদীভাঙনে এলাকার চিত্র বদলে গেলেও স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেক পরিবার এখন অন্যের জায়গায় বা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বুরুজান বিবি আকুতি জানিয়ে বলেন, "ঘরটুকুও থাকবে না। এই নদীতে আমার সব শেষ হইয়া গেছে। আমার অনেক জায়গা ছিল, নদী ভাঙনে সব হারাইছি। এহন আমার একটা ঘর আছে। সরকার যদি আমাদের দিকে না তাকায়, তাইলে সেটাও থাকবে না। এই গ্রামে ভালো বেড়িবাঁধ দরকার। যদি বেড়িবাঁধ হয়, তাইলে একটু শান্তি থাকতে পারমু।"
কৈবর্তখালী গ্রামের মসজিদের ইমাম রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের কারণে সন্তানদের স্কুল-মাদরাসায় যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার আশঙ্কা, এ বছর নদীগর্ভে মসজিদটিও চলে যেতে পারে।
জেলে সাত্তার শেখ বলেন, "আগে এই এলাকায় অনেক মানুষ থাকত। এখন জায়গাজমি যতটুকু ছিল, সব নদীতে গেছে। জোয়ার হলে পানিতে সব তলায় যায়। বন্যার সময় কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না।"
৬ পোল্ডারে ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ
পিরোজপুরের সাত উপজেলার অধিকাংশ এলাকাই নদীবেষ্টিত। পানি উন্নয়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছয়টি পোল্ডারে প্রায় ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ না থাকা, দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাশেদ খান বলেন, "পিরোজপুর জেলায় ছয়টি পোল্ডারে ৩৩৩ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ রয়েছে। কিছু স্থানে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। কোথাও ভাঙন দৃশ্যমান হলে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তিনি জানান, সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও কচা নদীর ভাঙন নিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি চলমান রয়েছে। স্টাডি শেষ হলে কোন কোন এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বেশি, তা নির্ধারণ করে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
টেকসই বেড়িবাঁধ ও সাইক্লোন সেন্টারের দাবি জানিয়ে ভুক্তভোগী বলেন, নদীভাঙন ঠেকাতে সাময়িক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা। নদীর গতিপথ ও ভাঙনপ্রবণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে শুধু ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, সড়ক ও বাজারসহ পিরোজপুরের আরও বহু জনপদ হারিয়ে যেতে পারে নদীগর্ভে।
Comments