উপসাগরীয় যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র জিতেনি, কিন্তু ইরান পরিণত হচ্ছে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে
ইসরায়েলের প্ররোচনায় ইরান আক্রমণ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জয় পাননি। কিন্তু ইরান নিজেও জিতেনি। বরং ধীরে ধীরে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে বলে ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাত, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে রাষ্ট্র হিসেবে ইরান ব্যর্থ হতে চলেছে বলে জানাচ্ছেন অনেক বিশ্লেষক।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি, তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংশয় এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিভাজন দেশটিকে অকার্যকর করে দিচ্ছে বলে ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে। নানা গুঞ্জনের পর রোববার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির ভিডিও প্রকাশ করে তেহরান। দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি ঘরে কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। সেই ব্যক্তিদের অবশ্য পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের সরকারি ও সরকারপন্থী গণমাধ্যম দাবি করেছে, ইরান-ওমানের যে সম্ভাব্য চুক্তি সামনে এসেছে, তার মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। কিন্তু ইরানের আপাত রাজনৈতিক বিজয়ের আড়ালে শাসনব্যবস্থার আরও গভীর একটি রূপান্তর ঘটছে—যা দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে পড়া এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়।
৫ আগস্ট চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, পেজেশকিয়ানই এমন কথা বললেন কেন? তিনি কি তাহলে বিচ্ছিন্ন এক প্রশাসন পরিচালনা করছেন?
সিনহুয়া জানায়, সম্প্রতি পেজেশকিয়ানকে তেহরানের একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কালো কাচ ঢাকা গাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়। এই ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। মোজতবা খামেনি নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন কি না, এমনকি নিজের দেশের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে আছে কি না—তাও স্পষ্ট নয়।
ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আসা এসব প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, দেশটির নেতৃত্ব তীব্রভাবে বিভক্ত। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সবচেয়ে কট্টরপন্থী অংশ মোজতবাকে একটি প্রতীকী বা পুতুল নেতা হিসেবে ব্যবহার করে চূড়ান্ত ক্ষমতা দখল করেছে—এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এর ফলে মোজতবা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডস উভয়েই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যা দেশের ভেতরে নতুন ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য 'ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক' বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা ঠেকাতে ইরানের সামরিক কমান্ড কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই কাঠামো আবার কেন্দ্রীভূত করা হবে—এমন সম্ভাবনা কম। ইসরায়েলেরও তেহরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, যারা অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে—এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
এই গুঞ্জন হয়তো এমন এক সর্বব্যাপী পারস্পরিক সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে যে কাউকে যেকোনো কারণে 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে অভিযুক্ত করা সম্ভব। অর্থাৎ ক্ষমতা কাঠামোর ভিতরের লোকজন কেউ কাউকে এখন পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না।
এসব পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বজায় রাখা অসম্ভব করে তুলছে। সর্বোচ্চ নেতা রয়ে গেছেন এক অদৃশ্য ব্যক্তিত্ব—যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে আরও কিছু অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্র।
সব মিলিয়ে এটি এমন এক দেশের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে গভীর ভাঙন ও বিশৃঙ্খলা চলছে এবং যা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রও টিকে থাকতে পারে এবং বিপজ্জনক অবস্থায় থাকতে পারে। মিয়ানমার বহু বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে রয়েছে, কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট বিজয় আসেনি; তবুও দেশটির সামরিক জান্তা এখনো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
সমস্যা হলো, ইরান তো একা ভুগবে না। একটি দুর্বল হয়ে পড়া ইরান মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অস্থিতিশীলতার অঞ্চল তৈরি করতে পারে।
Comments