বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ: প্রধানমন্ত্রী
একদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল জলরাশি ও ফেনিল তরঙ্গ, অন্যদিকে বাঁধভাঙা মানুষের কোলাহল। সামুদ্রিক ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে মুহুর্মুহু স্লোগান। এমন এক চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক পরিবেশে রোববার দুপুরে বাঁশখালীবাসীর মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রাম জেলায় এটিই তাঁর প্রথম সফর। আর দিনব্যাপী এই সফরের সবচেয়ে আবেগঘন স্থান হয়ে ওঠে বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন প্যান্ডেল।
ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সৈকতসংলগ্ন পুরো এলাকা রূপ নেয় এক জনসমুদ্রে। রোদের তীব্রতা আর দূরদূরান্তের পথ পেরিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন হাতে মিছিলে মিছিলে যোগ দেন সমাবেশস্থলে। তবে সমুদ্রপাড়ের এই সুধী সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য বিনোদন নয়। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণের সমর্থন থাকলে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করতে। আমাদের কাজ করতে হবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। শিল্পের বিপ্লব ঘটাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কয়দিন আগে বন্যা হলো অতিবৃষ্টির কারণে। এই বন্যায় বহু মানুষের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। আল্লাহর রহমতে ১০০ বাড়ির চাবি তুলে দিতে পারছি। কিছু দুস্থ মহিলাকে আমরা চাল দিয়ে সহযোগিতা করেছি। বর্তমান সরকারকে আপনারা নির্বাচিত করেছেন, এ বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। এ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এ দেশের মানুষের পাশে থাকা, সুখে দুঃখে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এ জন্যই নির্বাচনের সময় আমরা বলেছিলাম, বিএনপি যদি আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের ভোটে সরকার গঠনে সক্ষম হয় তাহলে আমরা মূল কয়েকটি কাজে হাত দেব। তার মধ্যে একটি কাজ ছিল এদেশের মায়েদের সহযোগিতার জন্য, এদেশের নারীরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সে জন্য আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড ঘরে ঘরে পৌঁছাব। যেটি আমির খসরু সাহেব উনার বক্তব্যে বলেছেন। আপনারা দেখেছেন, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা সেই ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্টের কাজে হাত দিয়েছিলাম এবং আল্লাহর রহমতে পাইলট প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এ মাসের ১৬ তারিখ থেকে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু করছি। সমগ্র দেশে এ বছর প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। এ উপজেলার মধ্যে ১০-১২ হাজার পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড আগামী অর্থবছরের মধ্যে তুলে দেব এবং আগামী চার বছর ধরে এটি চলবে। আরও অনেক মা-বোনেরা ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসবেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভাইদের পাশাপাশি যাতে বোনেরাও সংসারের হাল ধরতে পারে। একটি স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তুলতে পারে, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে। সেই জন্য মা'দের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য এ ব্যবস্থা করছি। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ডেরও ব্যবস্থাও করেছি।
ভিটেমাটি হারানো ১০০ পরিবারের নতুন স্বপ্ন
সাম্প্রতিক বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে যেসব পরিবার খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছিল, তাদের নতুন আশার আলো দিতেই বাঁশখালীতে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ দিন বাঁশখালী পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়নের সবচেয়ে অসচ্ছল এবং বন্যায় বিধ্বস্ত ১০০টি পরিবারের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগসহনশীল নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়। মাটির ঘর ধসে নিঃস্ব হওয়া জেলে সম্প্রদায় ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে এ তালিকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাহারছড়ার জেলেপাড়ার সন্তানহারা ও বন্যায় ঘর হারানো স্বামীহারা এক নারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রথম প্রতীকী চাবিটি।
সমাবেশস্থলে উপস্থিত স্থানীয় এক বাসিন্দা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, "আমাদের উপকূলীয় এলাকা সবসময় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। কিন্তু সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাদের কথা শুনেছেন, আমাদের হাতে ঘরের চাবি তুলে দিয়েছে। এটাই আমাদের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে।"
পর্যটন ও উপকূলীয় সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত এখনো পর্যটন মানচিত্রে সেভাবে স্থান পায়নি। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে বাহারছড়া সৈকত নতুন পরিচিতি পাবে। এতে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়সহ পুরো উপকূলীয় অর্থনীতির চাকা আরও বেগবান হবে।
চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর দিনভর ব্যস্ত কর্মসূচিতে ছিল বাঁশখালীতে চাবি হস্তান্তর, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর্থিক অনুদান ও ত্রাণ বিতরণ শেষে প্রধানমন্ত্রীর বাকি দিনের বাকি কর্মসূচি হলো ফটিকছড়ি সফর হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ি পৌঁছে বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত শেষে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও ৩০টি পরিবারের হাতে সহায়তা তুলে দেওয়া। এরপর সর্বশেষ সাংগঠনিক বৈঠক করবেন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত রেডিসন ব্লু হোটেলে, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। দিনভর নানা কর্মসূচি শেষে রাতেই প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
Comments