রেলওয়ের সিপিও দপ্তর থেকে উধাও গুরুত্বপূর্ণ নথি, উঠছে তথ্য গোপনের অভিযোগ
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালার কক্ষ থেকে এক রেল কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ নথি অলৌকিকভাবে গায়েব হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটি একটি সাধারণ নথি চুরির ঘটনা, নাকি সত্য ও তথ্য লোপাটের পরিকল্পিত চেষ্টা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সচেতন মহলে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের (সিসিএম) দপ্তরের আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়েছে। নথির নম্বর ৫৪.০১.১৫০০.১১৪.০৫.০০১.২৫। সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার খাতার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর নথিটি চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) বরাবর উপস্থাপন করা হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় নয় মাস নথিটি সিপিওর দপ্তরে থাকলেও এতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি নথিটির খোঁজ করতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি আর সিপিও কক্ষে নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট অফিস দপ্তরেও নথিটির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে নথিটি বাহিরে যাওয়ার কোন এন্ট্রি রেজিস্ট্রার খাতায় উল্লেখ নেই।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকদিন ধরে জিনিয়া নাসরিন নথিটির বিষয়ে জানতে সিপিও দপ্তরে গিয়ে সিপিও তরুণ কান্তি বালার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি নথির অবস্থান সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ফলে নথিটি কীভাবে উধাও হলো, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের সিআরবিতে কর্মরত রেলওয়ের এক কর্মী মাকসুদা আক্তার লিখি এবং তার স্বামী মাহবুবুর রহমান ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে জিনিয়া নাসরিনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, তিনি সরকারি চাকরির পাশাপাশি আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে দ্বৈত পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
অভিযোগের পর জিনিয়া নাসরিন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে ২টি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে জমা দেন। প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়, তিনি কখনো আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন না। একই সঙ্গে অভিযোগের জবাবে প্রয়োজনীয় সব বৈধ কাগজপত্রও প্রশাসনের নিকট দাখিল করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টরকে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হয়। পরবর্তীতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীনের নির্দেশে পুরো বিষয়টি একজন ব্যারিস্টারের আইনগত মতামতের জন্য পাঠানো হয়।
ব্যারিস্টারের লিখিত মতামতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, জিনিয়া নাসরিন দ্বৈত পেশায় যুক্ত থাকার মতো কোনো অপরাধ করেননি এবং সরকারি চাকরি বিধিমালার কোনো লঙ্ঘনও ঘটেনি। ওই আইনগত মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর সিপিও (পূর্ব) ও জিএম (পূর্ব)-এর কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পরে জিএম (পূর্ব) ও সিপিও (পূর্ব) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলে সিপিওর জেনারেল শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপন করা হয়।
রেজিস্ট্রার খাতার এন্ট্রি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর নথিটি সিপিওর কাছে উপস্থাপন করা হলেও দীর্ঘ নয় মাসেও সিপিও তরুণ কান্তি বালা নথিতে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা বা নিষ্পত্তি করেননি। এরই মধ্যে নথিটি রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি কীভাবে নিখোঁজ হলো, কার হেফাজতে থাকা অবস্থায় এটি হারিয়ে গেল এবং এর পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না এসব প্রশ্ন জনমনে।
এ বিষয়ে আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রত্যয়নপত্র, প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং ব্যারিস্টারের আইনগত মতামত সবকিছুতেই প্রমাণ হয়েছে আমি কোনো দ্বৈত পেশায় জড়িত নই এবং সরকারি চাকরি বিধিও লঙ্ঘন করিনি। এসব সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরই অলৌকিকভাবে পুরো নথিটি গায়েব হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, সঠিক তথ্য গোপন করতেই নথিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
জিনিয়া নাসরিন আরও বলেন, নথি গায়েব করে কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না কারন নথিটির প্রতিটি তথ্যই আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। সঠিক সময়ে প্রশাসনের নিকট উপস্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ পারসোনাল অফিসার (সিপিও) তরুন কান্তি বালার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নথিটি আমার কাছে বা আমার দপ্তরে নেই। রেজিস্ট্রার খাতার এন্ট্রি দেখানো হলে তিনি বলেন, এমন ফাইল চুরির ঘটনা পূর্বে ও অনেকবার ঘটেছে। ফাইল যদি আমার রুম থেকে চুরি হয় তবে আমিতো সারাক্ষণ ফাইল পাহারা দিতে পারবো না। যে ফাইলটি চুরি করেছে সে অবশ্যই চোর। যদি চোর ধরতে পারি তবে তাকে জেল খাটতে হবে। আমি ফাইলটি খোঁজ লাগাবো যদি পাওয়া না যায় তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নোটিশ পাঠাবো।
Comments