কর্ণফুলীর বুকে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতু, শেষ হবে চার দশকের ফেরি দুর্ভোগ
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-বান্দরবান- চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতু। প্রায় ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫২৩ মিটার দীর্ঘ এই দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মিত হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘ চার দশকের ফেরি-নির্ভর যাতায়াতের অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন, কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্ণফুলী নদীর এই ফেরিঘাট ১৯৮৪ সাল থেকে তিন জেলার মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা। কিন্তু প্রতিদিন ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ এবং জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী ও কৃষিপণ্যবাহী যানবাহনের ভোগান্তি যেন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে ছোট সাম্পানে নদী পার হতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষ।
এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর করতেই সরকার চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কে কর্ণফুলী নদীর ওপর দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রকৌশলগত দিক থেকে ক্যাবল স্টেইড সেতু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্থাপনা। এতে প্রধান পিলার থেকে শক্তিশালী ইস্পাতের ক্যাবলের মাধ্যমে সেতুর ডেক বা রাস্তা ধারণ করা হয়। ফলে নদীর মাঝখানে অতিরিক্ত পিলারের প্রয়োজন হয় না এবং নাব্যতা অক্ষুন্ন রেখেই মজবুত ও নান্দনিক সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়। সেতুটিতে আধুনিক টোল প্লাজা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেমও থাকবে।
প্রকল্পটি বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এটি চালু হলে বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও বাধাহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য তিন পার্বত্য জেলা থেকে কক্সবাজার যাতায়াত আরও সহজ হবে।
চন্দ্রঘোনা এলাকার বাসিন্দা সুমন বলেন, "সেতুটি নির্মাণ হলে এই এলাকার রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হবে। ফেরির জন্য আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না।"
বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কের মোটরসাইকেল আরোহী মিন্টু চাকমা বলেন, "বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে ফেরিতে চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। দ্রুত সেতু নির্মাণ হলে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে।"
রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কে চলাচলকারী বাসযাত্রী মো. মান্নান বলেন, "চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু না থাকায় ফেরিতে পারাপারের জন্য অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ হলে আমরা এই দীর্ঘদিনের কষ্ট থেকে মুক্তি পাব এবং যাতায়াত অনেক সহজ ও দ্রুত হবে।"
এ প্রসঙ্গে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতুর প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে এবং তা প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর হয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, "মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৫২৩ মিটার এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। প্রকল্প প্রস্তাব একনেকে অনুমোদন পেলে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হবে। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।"
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই সেতু শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই করবে না, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তাই দ্রুত প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দেখতে চান পাহাড়ের সর্বস্তরের মানুষ।
Comments