এমসি কলেজ গণধর্ষণ মামলা: প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন ও ৪ জন খালাস
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের বহুল আলোচিত মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর পর আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই, ২০২৬) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই ঐতিহাসিক রায় দেন।
মামলার আট আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজন অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস পেয়েছেন। দণ্ড ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী বলে জানা গেছে।
আজ দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় এবং দীর্ঘ শুনানির পর বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে রায় ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে সব আসামি উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁদের কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড। শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক এবং অর্জুন লস্কর এর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে। ১৩৪ বছরের পুরোনো এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক দম্পতি।
স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি স্ত্রীকে রাস্তার পাশে গাড়িতে রেখে একটু দোকানে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন কয়েকজন যুবক তাঁর স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করছে। প্রতিবাদ করলে ওই যুবকেরা স্বামী-স্ত্রী দুজনকে মারধর করে গাড়িসহ জোরপূর্বক কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে তরুণীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের ছেড়ে দিয়ে অপরাধীরা পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। তৎকালীন সময়ে অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত থাকায় পুলিশ শুরুতে ছাত্রাবাসে ঢুকতে গড়িমসি করে, যার সুযোগে আসামিরা পালিয়ে যায়। তবে গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হলে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের বিশেষ অভিযানে ৩ দিনের মধ্যে ৬ জন এজাহারনামীয় এবং ২ জন সন্দেহভাজনসহ মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় আরেকটি মামলা করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় ৮ জনের মধ্যে ৬ জনের অপরাধের সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ মেলে। ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আদালতে চার্জশিট জমা দেন। ২০২১ ও ২০২২ সালে যথাক্রমে ধর্ষণ এবং অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। গত বছরের মে মাসে মামলা দুটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হওয়ার পর বিচারপ্রক্রিয়া গতি পায়। ভুক্তভোগী তরুণী, তাঁর স্বামী, ম্যাজিস্ট্রেট ও ফরেনসিক চিকিৎসকসহ মোট ২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও গত বুধবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আজ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।
Comments