বিনিয়োগহীন অর্থনীতি
দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ কাজ না থাকা। নতুন কোন কল কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য তো গড়ে উঠছেই না, উল্টো বন্ধ হচ্ছে একের পর এক কারখানা। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর কারখানা বন্ধের মহামারি লাগে। অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের উদাসীনতায় মব উচ্ছৃঙ্খলতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সাধারণ ব্যবসা বাণিজ্যও।
নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তবর্তীকালীণ সরকার বিদায় নিলেও কারখানা বন্ধের ধারা বদলায় নি। সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত কিংবা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। যার অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক। বলা হচ্ছে, প্রতি মাসেই কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। আবার বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করছে কারখানাগুলো।
নতুন কোন বিনিয়োগ নেই। অথচ নতুন নতুন প্রেজেন্টেশন আছে বিডা (বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ) চেয়ারম্যানের। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বিনিয়োগ ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারে।
গত বছরও কম ছিল, এখন আরও কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,নতুন আসা প্রকৃত বিদেশি মূলধন (নেট ইক্যুইটি ইনপ্রো)-গত চার প্রান্তিকের মধ্যে এই মার্চ প্রান্তিকে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
ইক্যুইটি বিনিয়োগ হলো মূলত দেশে প্রবেশ করা একদম নতুন বিদেশি পুঁজি। এই খাতে এমন তীব্র পতন ইঙ্গিত দেয় যে,বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়।
নির্বাচন সহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও কারণ আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর দ্বারা বাংলাদেশের ঋণমান বারবার কমিয়ে দেওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ বিনিয়োগ করার আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই রেটিংকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পাশাপাশি বিনিয়োগের পর তারা সহজেই অর্জিত মুনাফা ও পুঁজি নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যেতে পারবেন কি না,তাও যাচাই করেন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের হারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এসব কারণে নতুন বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং ইকুইটি বিনিয়োগের প্রবাহও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়া একটি উদ্বেগজনক সংকেত,যা প্রমাণ করে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী নন।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং প্রায় অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও বাহ্যিক পুঁজি বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ আফ্রিকার ছোট ছোট দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বলে 'ইউনক্টাড ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬'-এ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘানা, উগান্ডা এবং কঙ্গোর মতো দেশগুলো বড় ধরনের আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ সফলভাবে আকর্ষণ করতে পেরেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশের বেসরকারি খাতে স্থানীয় বিনিয়োগও কমে যাচ্ছে। দেশীয় উদ্যোক্তারাও বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মতোই সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
Comments