জনসংখ্যা বৃদ্ধি: উপেক্ষার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সাফল্যের কথা গর্বের সঙ্গে বলা হয়েছে-জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। স্বাধীনতার পর যে দেশে একজন মা গড়ে ছয়/সাতটি সন্তানের জন্ম দিতেন, সেই দেশ ধারাবাহিক পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বহু বছর স্থিতিশীল থাকার পর প্রথমবারের মতো টিএফআর আবার বেড়েছে। প্রতি ১০ জন মা যেখানে আগে মোট ২৩ জন সন্তানের জন্ম দিতেন, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৪। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব মোটেও ছোট নয়।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনঘনত্বপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের মধ্যে জনসংখ্যার সামান্য বৃদ্ধি পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ-সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। ফলে টিএফআরের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নীতিগত দুর্বলতার ফল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের শূন্য পদ পূরণ না হওয়া, সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রয়োজনের সময় দম্পতিদের এসব সামগ্রী না পাওয়া-সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কর্মসূচি একসময় বাংলাদেশের সাফল্যের আন্তর্জাতিক উদাহরণ ছিল, সেটিই আজ গুরুত্ব হারিয়েছে।
জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষক, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), ইউনিসেফ এবং আইসিডিডিআরবি-সবাই এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। কারণ, জনসংখ্যা একবার দ্রুত বাড়তে শুরু করলে তা নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ভর করে ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার আকার ও গঠনের ওপর। যদি সেই হিসাবই বদলে যায়, তবে উন্নয়নের পুরো কাঠামো নতুন করে চাপে পড়ে।
এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক বার্তারও একটি প্রভাব রয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তিনি বোঝা নয়, শক্তি হিসেবে দেখেন এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কত দূর যাওয়া উচিত, তা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। নিঃসন্দেহে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করা একটি রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনীতি। কেবল জনসংখ্যা বেশি হলেই তা সম্পদে পরিণত হয় না। পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ ছাড়া অতিরিক্ত জনসংখ্যা বরং বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
পরিবার পরিকল্পনার স্লোগান পরিবর্তনের ঘটনাও নীতিগত দ্বিধার প্রতিফলন। আশির দশকের "ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট" থেকে ২০০৪ সালে "দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়"—এই পরিবর্তন পরিবার ছোট রাখার বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ২০১২ সালের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিতেও একটি সন্তানের প্রতি উৎসাহের বিষয়টি ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে আবার আগের স্লোগানে ফিরে যাওয়া জনসচেতনতার ধারাবাহিকতায় এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছেও এই পরিবর্তন একটি মিশ্র বার্তা পৌঁছে দেয়।
বাস্তবতা হলো, পরিবার পরিকল্পনা শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। যখন একজন নারী নিজের ইচ্ছামতো সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখন তাঁর শিক্ষা, কর্মজীবন ও স্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে পরিবারের প্রতিটি সন্তানের পেছনে বেশি বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আজ যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং নগর এলাকায় অতিরিক্ত জনচাপ-এসব বিবেচনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির নতুন প্রবণতা আরও উদ্বেগ বাড়ায়। সীমিত সম্পদের দেশে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি উন্নয়নের সুফলকে ক্ষয় করে দিতে পারে।
এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর উদ্যোগ। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে, মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং গণমাধ্যমে নতুন করে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। পাশাপাশি তরুণ দম্পতিদের মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্য ও দায়িত্বশীল পরিবার গঠনের বিষয়ে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।
বাংলাদেশ একসময় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল। সেই অর্জন ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে। জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন প্রতিটি মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা যাবে। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা উন্নয়নের শক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ হিসেবেই ফিরে আসবে।
Comments