বিপৎসীমার ওপরে তিস্তা: লালমনিরহাটে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, ঝুঁকিতে শত শত পরিবার
ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণের ফলে তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি এখন বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যা এবং শত শত পরিবারের পানিবন্দি হয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত ৯টায় তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ মিটার। এই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার হওয়ায় পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করলেও তা বিপৎসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে মঙ্গলবার রাতের ভারী বৃষ্টি এবং উজানের ঢলের কারণে বুধবার থেকে পানির প্রবাহ হু হু করে বাড়তে শুরু করে, যা বৃহস্পতিবার রাতে বিপৎসীমা অতিক্রম করে। ইতিমধ্যে চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
পানির চাপ আরও বাড়লে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং নদীতীরবর্তী উঁচু সড়কগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এসব বাঁধ চলতি বন্যায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের সমালোচনা করে স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শুষ্ক মৌসুমে কাজ করলে ফাঁকি দেওয়া যায় না। আর বর্ষায় কাজ করলে কাজ না করেও বলা যায় কাজ করেছি। এসব কারণে নদীর স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। বর্ষা এলেই কেবল সিসি ব্লক আর বালুর বস্তা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায়।"
নদীপাড়ের গোবর্দ্ধন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, "ভারী বৃষ্টির কারণে পানি দ্রুত বাড়ছে, অনেক বাড়িতেই পানি উঠে যাবে। চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হলে শিশু, বৃদ্ধ আর প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয়। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি রাখার জায়গা থাকে না। তার ওপর যোগ হয় সাপ-পোকার আতঙ্ক। বন্যা এলে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। বন্যা যতদিন থাকে, আমাদের দুর্ভোগ চলে তার চেয়েও অনেক বেশি সময়।"
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, "বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এই পয়েন্টে পানির প্রবাহ বেড়েছে, যার ফলে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি যদি এমন থাকে তবে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।"
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ—শুষ্ক মৌসুমে বাঁধের টেকসই সংস্কারকাজ না করে ফেলে রাখা হয় এবং বর্ষা এলেই কেবল 'জরুরি মেরামত'-এর নামে জোড়াতালির কাজ শুরু হয়, যা নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি রোধে তেমন কোনো কাজে আসে না।
Comments