ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা: বাতিল করা ছিল আ. লীগের ঐতিহাসিক ভুল
পঞ্চদশ সংশোধনীসংক্রান্ত আপিল খারিজ হয়ে গেছে। হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল থাকছে। অর্থাৎ, সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল হয়ে ফিরে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। সাথে ফিরল গণভোটও। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হয়েছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগ একটি সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশ দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রসপেকটিভলি অর্থাৎ ভবিষ্যতের জন্য বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। তবে রায়ে আরও বলা হয়েছিল, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে করেনি। করেছিল নিজের দলীয় সরকারের অধীনে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা ছিল বাকশালের পর আওয়ামী লীগের আরেকটি ঐতিহাসিক ভুল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের প্রায় ১৫ মাস আগেই একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল। নাগরিক ও রাজনৈতিক সমাজ তখনই বলেছিল, যেভাবে একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, তাকে বলা যায় 'সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কতন্ত্র'।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের এ ধরনের মতামত চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে কোনোমতেই সংগতিপূর্ণ নয়। আর এর পরিণতিও শুভ হয় না। এর মাধ্যমে সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতের রাজনীতিরই প্রসার ঘটে। দেখা গেল সেটিই ঘটেছে এবং শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে।
বিস্ময়ের বিষয় ছিল—যে আওয়ামী লীগ এক সময় নিজে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য দুর্বার গণ-আন্দোলন করে বিএনপি সরকারের পতন ঘটিয়ে দাবি আদায় করে নিয়েছিল, সে নিজে ক্ষমতায় বসে তা বাতিল করে দেয়। এরপর তিন-তিনটি নির্বাচন করে একতরফাভাবে এবং নিজের একচেটিয়া বিজয় নিশ্চিত করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ এক সময় বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য আওয়ামী লীগ কৃতিত্বও দাবি করত। সে দলটিই আবার এ ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়, যার জের ধরে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে হাবুডুবু খেয়েছে দীর্ঘ সময়।
এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার খর্ব হয় এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যার পরিণতিতে ২০২৪-এ গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যা আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে।
এর ফলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, যার পরিণতিতে পুরো নাগরিক সমাজ, তরুণ সমাজ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলে যায়। আন্তর্জাতিক সমাজও দলের পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
Comments