খামেনির শেষযাত্রার বার্তা: ইরানের রাষ্ট্র,জনগণ ও প্রতিরোধের রাজনীতি
তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের শেষকৃত্য শুধু একটি ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়;এটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতি,জাতীয় সংহতি এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপের রাজনীতিকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। সামরিক সংঘাতের পর যে দৃশ্য বিশ্ব দেখছে,তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট - বাহ্যিক চাপ কিংবা সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা সবসময় সম্ভব হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতিগত লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করা এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চাপে ফেলা। ধারণা করা হয়েছিল,শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। সংঘাতের পর ইরানের জনগণের একটি বড় অংশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ভুলে জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে একত্রিত হয়েছে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে,বাইরের আগ্রাসন প্রায়ই একটি বিভক্ত জাতিকেও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। ইরানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
খামেনির শেষকৃত্যে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ শুধু একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নয়;এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এমনকি পর্যবেক্ষকদের মতে,এই শোকযাত্রা ইরানের বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্যের সমান কিংবা তার চেয়েও বড় জনসমাগমের সাক্ষী হতে পারে। এটি ইঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও রাষ্ট্রের সংকটকালে জনগণের একটি বড় অংশ নেতৃত্বের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
এই শেষকৃত্যে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক নেতৃত্ব তো ছিলই, কারণ দেশটি শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্ততা করেছে। রাশিয়া,চীন,সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখায় যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ভূ-রাজনীতিতে বাস্তবতা অনেক সময় আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না;তিনি লক্ষ লক্ষ অনুসারীর ধর্মীয় পথপ্রদর্শকও ছিলেন। তাই তাঁর শেষযাত্রা তেহরানের গণ্ডি পেরিয়ে কোম,ইরাকের নাজাফ ও কারবালার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রেও পালিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে,তাঁর প্রভাব কেবল ইরানের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না;বরং বৃহত্তর শিয়া মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাঁর গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংযোগ ছিল।
অবশ্য এটাও সত্য যে ইরান বহুদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকট,আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা,ৱরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অসন্তোষের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সেই দেশের জনগণেরই। ইতিহাসে বহিরাগত শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের বহু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং অনেক সময় সংঘাত,গৃহযুদ্ধ এবং আরও গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও সেই প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে-রাষ্ট্র পরিবর্তনের পথ কি বাইরে থেকে নির্ধারণ করা যায়?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যেও দ্রুত নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড বা নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো কার্যকর রয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। কোনো ব্যক্তির মৃত্যু রাষ্ট্রকে অচল করে দেয়নি;বরং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো,ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে? সংঘাত,নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কি নতুন করে অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে,নাকি কূটনীতির পথ আবারও গুরুত্ব পাবে? যুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে,সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা মুছে ফেলা সহজ নয়। দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা শুধু এই অঞ্চলের সমস্যা নয়;এর প্রভাব জ্বালানি নিরাপত্তা,বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে। তাই প্রতিশোধের রাজনীতি নয়,বরং পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগই হতে পারে টেকসই সমাধানের ভিত্তি। ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এই শিক্ষা দিয়েছে যে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেই জাতির জনগণেরই থাকা উচিত। বাইরের শক্তির চাপ হয়তো সাময়িক পরিবর্তন আনতে পারে,কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান কখনোই জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
Comments