শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ
আজ ২৬ জুন, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনের পুরোধা, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও 'শহীদ জননী' জাহানারা ইমামের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের একটি হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে প্রয়াণ ঘটে এই মহীয়সী নারীর। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের চেতনা রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার আন্দোলনে তিনি ছিলেন এক আপসহীন ও অনন্য প্রেরণার উৎস।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল 'জুড়ূ'। বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা ছিলেন সৈয়দা হামিদা বেগম।
পিতার চাকুরিসূত্রে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি 'ফুলব্রাইট স্কলার' হিসেবে আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
কর্মজীবন: শিক্ষাকতা থেকে সাহিত্য
তিনি ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬৮ সালে তা ছেড়ে দেন। এ ছাড়া কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন তিনি।
ষাটের দশকে ঢাকার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য মহলে তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর রচিত শিশু-কিশোর উপযোগী গ্রন্থগুলো দারুণ প্রশংসিত হয়। তবে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত দিনপঞ্জি রূপের অনন্য গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি'। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দেশপ্রেম এবং গেরিলা অভিযানের মর্মস্পর্শী ও শিহরণমূলক বাস্তব চিত্র চিরকুট ও গোপন সংকেতের মাধ্যমে লিখে রেখেছিলেন তিনি, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অবিনাশী দলিল হিসেবে রূপ নেয়।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— অন্য জীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, জীবন মৃত্যু, চিরায়ত সাহিত্য, বুকের ভিতরে আগুন, নাটকের অবসান, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, নয় এ মধুর খেলা, ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস এবং প্রবাসের দিনলিপি।
যেভাবে হলেন 'শহীদ জননী'
১৯৭১ সালে জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রত্ব ছেড়ে দিয়ে বীরত্বপূর্ণ গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনের পর আগস্টের শেষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তিনি বন্দি ও শহীদ হন। একই বছরের ডিসেম্বরে বিজয় অর্জনের মাত্র কয়েকদিন আগে স্বামী শরীফ ইমামও অবরুদ্ধ দেশে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।
এক সন্তান হারিয়ে কোটি মুক্তিযোদ্ধার মা হয়ে ওঠেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রুমীর সহযোদ্ধা ও দেশের সমস্ত মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে মায়ের মর্যাদা দেন এবং তিনি দেশজুড়ে সর্বজনীন 'শহীদ জননী' উপাধিতে ভূষিত হন।
ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও ঐতিহাসিক 'গণ-আদালত'
স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ চক্রের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে ক্ষুব্ধ হয়ে শহীদ জননী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় 'একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি'। পরবর্তীতে তিনি তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল তরুণ সমাজকে সাথে নিয়ে 'শহীদ জননী' গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক 'গণ-আদালত'।
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এই গণ-আদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার সম্পন্ন করা হয় এবং তাঁর ১০টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন স্বৈরাচারী ও পাকিস্তানপন্থী শক্তির রক্তচক্ষু এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন উপেক্ষা করে তিনি এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
শেষ প্রয়াণ ও চিরন্তন প্রেরণা
জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই মহীয়সী নারী মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলন থেকে এক চুলও নড়েননি। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ বাংলাদেশে এনে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই বীর মাতাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল ত্যাগ, আপসহীনতা ও দেশপ্রেমের আলোকবর্তিকা হিসেবে বেঁচে থাকবেন।
Comments