অবশেষে হরমুজ পেরিয়েছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ চার মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ 'এমভি বাংলার জয়যাত্রা'।
সোমবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোররাত তিনটায় জাহাজটি সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বর্তমানে জ্বালানি বা বাংকারিং নেওয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বিএসসির সুনিপুণ নৌ-কৌশলে জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু ও নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় এই চরম সংকটমুক্ত হলেন।
জাহাজে কর্মরত অতিরিক্ত চিফ অফিসার প্রণয় সাহাও ক্ষুদে বার্তায় মুক্ত হওয়ার আনন্দ ও স্বস্তির খবর নিশ্চিত করেছেন। সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তারা হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এর ঠিক তিন ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ৩টায় আরেকটি বার্তায় তিনি নিশ্চিত করেন। সব বাধা পেরিয়ে জাহাজটি এখন নিরাপদ জলসীমায়।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাসের সময় জাহাজের একেবারে কাছাকাছি এলাকায় ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে। অল্পের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান বাংলাদেশি নাবিকরা। ওই দিনই ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পারস্য উপসাগর। যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইরান এই সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) হিসাব অনুযায়ী, হরমুজের চারপাশে এখনো প্রায় ১,৬০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রয়েছে।
জানা গেছে, প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল 'বাংলার জয়যাত্রা'র। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি বারবার আটকা পড়ছিল। নাবিকদের ফিরিয়ে আনতে ও জাহাজটি মুক্ত করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিএসসি যৌথভাবে আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ বজায় রাখে। এর আগে তিন তিনবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হয়েছিল। তবে সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধে নতুন কিছু অগ্রগতি হওয়ায় চতুর্থবারের মতো ঝুঁকি নিয়ে বুক বাঁধে বিএসসি। আর তাতেই আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার এই বাল্ক ক্যারিয়ারটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে ধেয়ে চলছে। বিএসসি জানিয়েছে, সেখানে পৌঁছানোর পর জাহাজটির বাংকারিং (জ্বালানি সংগ্রহ) ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্লিয়ারেন্স বা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পর নাবিকদের স্বজনদের মাঝে ফিরেছে স্বস্তি। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বুকভরে শ্বাস নিচ্ছেন ৩১ জন বীর বাংলাদেশি নাবিক, যারা যুদ্ধের গোলাবারুদের মাঝেও দেশের পতাকাবাহী জাহাজটিকে আগলে রেখেছিলেন।
Comments