এনবিএফআই সংকট ঘিরে বড় প্রশ্ন : লুটপাটের দায় কার,ক্ষতির বোঝা কেন আমানতকারীর?
বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন সরকারি ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এর ফলে প্রায় ৭৬ লাখ গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা নতুন কাঠামোর আওতায় আসবে। তবে একই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সংকটে থাকা পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) প্রায় ২৭ হাজার আমানতকারীর ভবিষ্যৎ কী হবে?
বিগত কয়েক বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা অর্থ ফেরত না পেয়ে হাজারো গ্রাহক চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার খরচ, অবসর জীবনের নিরাপত্তা কিংবা জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে সঞ্চিত অর্থ আটকে থাকায় অনেক পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তারা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন এবং আমানতের টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে সংকটে থাকা পাঁচটি এনবিএফআই – ফাস ফাইন্যান্স, ফার ইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপল'স লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং বন্ধ বা অবসায়নের পথে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী,এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের মধ্যে,ফলে তারা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা বা আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে।
ব্যাংক রেজলিউশন আইনের আওতায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একজন প্রশাসক ও দুজন অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে নন-অপারেশনাল ঘোষণা করে লিকুইডেশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে একটি আলোচিত প্রস্তাবকে ঘিরে। বিভিন্ন মহলে প্রচার হয়েছে যে,ব্যক্তিগত আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। বিষয়টি আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। কারণ অনেকেরই আমানতের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি।
তবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ফেরতের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান-এর বক্তব্য অনুযায়ী,এটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবনার মধ্যে একটি মাত্র;কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ব্যক্তিগত আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন,আগামী বাজেটে এ লক্ষ্যে সরকারি বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আইন অনুযায়ী অবসায়িত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে দায়-দেনা নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও আলোচনায় এসেছে। সরকার এখান থেকেই এই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
অমানতকারীদের মূল প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্রের অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে অর্থ জমা রেখে তারা কী অপরাধ করেছেন? যদি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক,ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ,রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার কারণে অর্থ লুটপাট হয়ে থাকে,তাহলে সেই দায় কেন সাধারণ গ্রাহকদের বহন করতে হবে?
বাস্তবতা হলো,এই সংকটের জন্য দায়ী নয় আমানতকারীরা;বরং তারাই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির দুর্বলতা,রাজনৈতিক প্রভাব,অনিয়ম এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্নীতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের বৈধ সঞ্চয়ের বড় অংশ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলা ন্যায়সংগত হবে না।
আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। যদি মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রাখার পরও পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই,তাহলে শুধু এনবিএফআই খাত নয়,সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেই আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
এ কারণেই অনেকের মতে,অবসায়ন প্রক্রিয়ার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা,পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে আমানতকারীদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরতের পথ খুঁজতে হবে।
Comments