অর্থনীতির তুলনায় রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে গত এক দশকে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ধীর ছিল, যা দেশের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অপূর্ণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় রাজস্ব বুয়েন্সি ছিল ০.৯৩। রাজস্ব বুয়েন্সি হলো এমন একটি সূচক, যা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় সরকারি রাজস্ব কত দ্রুত বাড়ছে তা পরিমাপ করে।
সাধারণত, বুয়েন্সি সহগ ১-এর বেশি হলে বোঝায় যে রাজস্ব আদায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত বাড়ছে, যা একটি দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতিফলন। বিপরীতে, ১-এর নিচে থাকলে তা রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত দুর্বলতা বা সীমিত করভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাজস্ব বুয়েন্সি অত্যন্ত অস্থির ছিল। এটি ২০২০-২১ অর্থবছরে ২.১০-এ পৌঁছালেও পরের বছর ০.১৫-এ নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল মাত্র ০.৬০।
প্রতিবেদনে বলা হয়,"গড়ে ০.৯৩ বুয়েন্সি নির্দেশ করে যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।"
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী,২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে দেশের নামমাত্র জিডিপি গড়ে বছরে ১১.৭১ শতাংশ হারে বেড়েছে। একই সময়ে প্রকৃত কর রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ১১.৪ শতাংশ হারে।
অর্থ বিভাগের মতে,এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না,ফলে দেশে এখনো বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব আহরণ অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
ডিজিটাল সংস্কার ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নের তাগিদ
অর্থ বিভাগ মনে করে,বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে রাজস্ব ব্যবস্থায় ডিজিটাল সংযোগ ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর জোর দিতে হবে। এতে রাজস্ব সংগ্রহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ
মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহের তুলনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়,অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ এখনো সীমিত রাজস্বভিত্তি ও দুর্বল সংগ্রহ দক্ষতার মধ্যে আটকে আছে।
২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ছিল: ভুটান: ২৭.৮%, ভারত: ২১%, মিয়ানমার: ২০.৩%, নেপাল: ২০%, ভিয়েতনাম: ১৯.৯%, বাংলাদেশ: মাত্র ৭.৯%।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,"বাংলাদেশের এই নিম্ন করহার স্পষ্ট করে যে সম্ভাব্য রাজস্ব উৎস থেকে আরও কার্যকরভাবে কর আদায়ের জন্য করনীতি ও কর প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।"
কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাত বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থ বিভাগের মতে,বৃহৎ কৃষিখাত এবং কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কার্যকর কর প্রশাসনের পথে বড় বাধা। পাশাপাশি কর প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের অভাব এবং করদাতাদের মধ্যে কর প্রদানে অনীহাও রাজস্ব সংগ্রহকে বাধাগ্রস্ত করছে।
টিআইএনধারী ও রিটার্ন দাখিলকারীর মধ্যে বড় ব্যবধান
প্রতিবেদনে করদাতাদের নিবন্ধন ও প্রকৃত করদানের মধ্যে বড় ধরনের ফারাকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিআইএনধারীর সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ২০ লাখে পৌঁছালেও মাত্র ৪৬ লাখ আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ টিআইএনধারী রিটার্ন দাখিল করেননি। ফলে কর-অনুগত্যের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ লাখ করদাতায়, যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাধ্যতামূলক অনলাইন রিটার্ন দাখিলের ফলে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন জমা ২৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বোঝা যায়,ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা করদাতাদের অনুগত্য বাড়াতে এবং কর সংস্কৃতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশের মোট কর রাজস্বের ৮৮ শতাংশ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ভ্যাট,সম্পূরক শুল্ক,কাস্টমস ডিউটি ও অন্যান্য করসহ পরোক্ষ কর থেকে আসে ৬৫.৬ শতাংশ রাজস্ব। অন্যদিকে আয়করসহ প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ৩৪.৪ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো মূলত ভোগভিত্তিক পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Comments