বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সতর্কবার্তা: ব্রাজিল কি সত্যিই শিরোপার দাবিদার?
বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু নামী ফুটবলার থাকলেই হয় না,দরকার ছন্দ,বোঝাপড়া এবং ধারাবাহিকতা। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করে সেই বাস্তবতাই যেন নতুন করে উপলব্ধি করল ব্রাজিলের টিম। প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর চেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় ছিল তাদের খেলার ধরন। কারণ ফলাফল বদলানো যায়,কিন্তু মাঠে দেখা দেওয়া দুর্বলতাগুলো যদি দ্রুত দূর করা না যায়,তবে বিশ্বকাপের ট্রফির পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রথম ১৫ মিনিটে হারিয়ে যাওয়া ব্রাজিল
ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিল-কে দেখে মনে হচ্ছিল না এটি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল। মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণে অস্থিরতা এবং পাসিংয়ে বারবার ভুল-সব মিলিয়ে দলটি যেন নিজেদের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সুযোগ হাতছাড়া করেনিমরোক্কো। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে তারা ব্রাজিল-কে চাপে ফেলে দেয়।
২১ মিনিটে ইসমাইল সাইবারির গোল সেই আধিপত্যেরই পুরস্কার। ব্রাজিলের দুই সেন্টার-ব্যাককে পরাস্ত করে তাঁর নিখুঁত ফিনিশিং ছিল আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রাইকারসুলভ প্রদর্শন।
ভিনিসিয়াসের পায়ে আশার আলো
তবে সব অন্ধকারের মাঝেও আলো দেখালেন ভিনিসিউস। বাঁ প্রান্ত থেকে ভেতরে কেটে এসে তাঁর দুরন্ত শট শুধু গোলই নয়,ছিল আত্মবিশ্বাসেরও বার্তা। বহুদিন ধরে জাতীয় দলের জার্সিতে ক্লাব পর্যায়ের সেরা পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করতে না পারার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এই ম্যাচে সেই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন তিনি। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়-একজন ভিনিসিয়াস কতদিন দলকে একা টেনে নিয়ে যাবেন? বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন দলগত শক্তি।
রক্ষণে উদ্বেগের মেঘ
ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে রক্ষণভাগ বরাবরই ভরসার জায়গা। কিন্তু বর্তমান দল সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সুবিচার করতে পারছে না মারকুইনহোস এবং গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহায়েস-এর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট ছিল। মরক্কোর গোলের সময় দু'জনেরই ভুল অবস্থান গ্রহণ বিপদ ডেকে আনে।
বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে এমন ভুলের মূল্য অনেক বেশি। স্পেন বা ফ্রান্স টিম সেই সুযোগ একবারও নষ্ট করবে না।
কাসেমিরোর ছন্দপতন
একসময় ব্রাজিলের মাঝমাঠের প্রাণ ছিলেন কাসেমিরো। কিন্তু এই ম্যাচে তাঁকে দেখে সেই পরিচিত দৃঢ়তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাসিং,বল দখল এবং রক্ষণে সহায়তা- কোনও ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারেননি তিনি। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে বিরতির পর তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ কার্লো আনসেলত্তি।
ফলে প্রায় একাই মাঝমাঠ সামলাতে য়েছে ব্রোনো গুইমারাসকে। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে এই নির্ভরতা বিপজ্জনক হতে পারে।
স্ট্রাইকার সংকট এখনও কাটেনিয
ব্রাজিল মানেই একসময় ছিল গোলমেশিন ফরোয়ার্ডদের দেশ। রোনাল্দো, রিভালদোদের উত্তরাধিকার বহন করার মতো স্ট্রাইকার বর্তমানে দলে নেই। এদিন ইগোর থিয়াগো সুযোগ পেলেও নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। গোলের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নষ্ট করা থেকে শুরু করে পুরো ম্যাচে কার্যত অদৃশ্য ছিলেন তিনি।
বিকল্প হিসেবে বেঞ্চে থাকা এন্ডরিক-কে আরও আগে নামানো যেত বলেই মনে করেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।
শেষ কথা
ড্র সবসময় খারাপ ফল নয়। কিন্তু এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-ব্রাজিল এখনও বিশ্বকাপ জয়ের মতো পরিপূর্ণ দল হয়ে ওঠেনি। ভিনিসিয়াসের প্রতিভা,দ্বিতীয়ার্ধের লড়াই এবং আনচেলোত্তির অভিজ্ঞতা আশার কারণ হতে পারে। তবে রক্ষণে সমন্বয়,মাঝমাঠে গতি এবং আক্রমণে কার্যকারিতা না বাড়লে ট্রফির স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
মরক্কোর বিরুদ্ধে এক পয়েন্ট হয়তো উদ্ধার করা গেছে,কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে ব্রাজিল-কে নিজেদের অনেকটাই বদলাতে হবে। প্রথম ম্যাচের পর সেই সতর্কবার্তাই সবচেয়ে জোরালোভাবে শোনা গেল।
Comments