বাংলাদেশি রবিন খুদা কেন ভারতে বিনিয়োগ করেন?
অনলাইনে একটা ছবি ঘুরছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে হাত মিলিয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছেন এক তরুণ। তার নাম রবিন খুদা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান ধনকুবের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ক্লাউড কম্পিউটিংখাতে ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে তার কোম্পানি।
তার জন্ম ও প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে এবং ঢাকাতেই। তিনি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে ও এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজে পড়াশোনা করেছেন। রুবিন খুদা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে স্ত্রী, দুই কন্যা ও বাবা-মাকে নিয়ে বসবাস করছেন। তবে তার পারিবারিক শেকড় বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার ছাতিয়ানতলী গ্রামে।
সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশিদের আহাজারি। কেন রবিন খুদা বাংলাদেশে বিনিয়োগ না করে ভারতে করছেন। বিনিয়োগের পরিমাণটা বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক সঞ্চয়ের সমান।
যদি সামান্য পিছনে যাই তাহলে দেখি – নোবেল জয়ী ইউনূস তার মতোই বিদেশ থেকে উড়িয়ে এনেছেন এক যুবককে। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বানিয়েছেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। তার নাম আশিক চৌধুরী। তিনি ইতিম্যধ্যেই প্রেজেন্টেশন চৌধুরী নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। কারণ তিনি ইউনূস-কে সামনে রেখে, বিদেশিদের উপস্থিতিতে বড় বাজেটের এক বিদেশি বিনিয়োগ সম্মেলন করলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে,আর দেখালেন প্রেজেন্টেশনের চমক। দিন যায়, মাস যায়। এই প্রেজেন্টেশন দেখে ইউনূসের তৎকালীন প্রেস সচিব বারবার বলেছেন দেশে চাকরির বন্যা বয়ে যাবে। দেশে বিনিয়োগ সম্মেলনে করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ সরকারি সফরও করেন আশিক চৌধুরী। তবে এর কার্যকর ফল দেখা যায়নি, উল্টো কয়েকটি দেশ থেকে এফডিআই আসা কমেছে।
বেকারত্বের বন্যা ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান হয়নি এখন পর্যন্ত। বিনিয়োগ আর আসে না। বলতে গেলে বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগ খরা চলছে। অথচ এই আশিক চৌধুরী এখনও বহাল আছেন নিজের পদে, যদিও ইউনূস সাহেব নেই।
প্রশ্ন হলো রবিন খুদা কেন বাংলাদেশে এক টাকাও বিনিয়োগ করেননি? বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হন, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে তাদের কাউকেই এ দেশের মূল অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগ করতে দেখা যায় না। রবিন খুদাও তার ব্যতিক্রম নন। রবিন খুদা, অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনী এবং হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার জায়ান্ট 'এয়ারট্রাঙ্ক'-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার কোম্পানি আজ অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। কিন্তু এত বড় তালিকায় বাংলাদেশের নামটা কোথাও নেই;এ দেশে তার কোনো দৃশ্যমান বিনিয়োগ নেই।
এবার নতুন করে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের ডাটা সেন্টার প্রকল্পে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের। এর অংশ হিসেবে গত শুক্রবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকও করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিপুল অর্থ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করবে তার সংস্থা। রবিন খুদার এই বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে নরেন্দ্র মোদী নিজে এক্স-এ উচ্ছ্বসিত বিবৃতি দিয়েছেন। আর এদিকে বাংলাদেশের মানুষ আহাজারি করছে।
একটা চরম সত্য হলো-আবেগ আর ব্যবসা কখনোই একসাথে চলে না। রবিন খুদা এ মাটির সন্তান। কিন্তু এ দেশ আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের কোনো বড় বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ, অবকাঠামো কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তৈরি করে দিতে পারেনি। তাই আবেগ আড়ালে পড়ে থাকে, আর কোটি কোটি ডলার চলে যায় অন্য কোনো দেশে।
বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ২০২৫ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ দেশে ব্যবসায় পরিবেশ তথা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো পাঁচটি বড় বাধা রয়েছে। এগুলো হলো বিদ্যুতের সমস্যা, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, দুর্নীতি, অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্য ও উচ্চ করহার।
বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগের আগে অবশ্যই এ প্রতিবেদন দেখে থাকবেন। রবিন খুদাও দেখবেন তার অর্থ কোথায় নিরাপদে বিনিয়োগ করা যাবে।
আসলে বাংলাদেশটা হয়ে গেছে কিছু লোকের পদ পদবি দখল আর টাকা বানানোর হাতিয়ার। কিন্তু দেশটা তাদের নয়। যেমন আশিক চৌধূরী – সর্বোচ্চ কর্পোরেট জব করেও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা কোথাও পেতেন না, কিন্তু দেশের মানুষকে চমক দেখানোর চেষ্টা করেছেন স্লাইড প্রেজেন্টেশনে।
ইউনূস সাহেব নাকি ম্যাজিক দেখাবেন-বাংলাদেশের মানুষ তেমনটাই বলতেন আর বিশ্বাস করতেন। আর ম্যাজিক দেখাতেই তিনি সিঙ্গাপুর থেকে তরুণ ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে উড়িয়ে এনেছিলেন। তবে আকাশ থেকে ডাইভ দেওয়া আর পাঁচ তারকা হোটেলে প্রেজেন্টেশন ছাড়া কোন ম্যাজিক দেখাতে পারেননি আশিক, যেমন পারেন নি ইউনূসও। এই চেয়ারে বসার পর দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
দেশে নিট এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ আসা কমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে করোনাকাল থেকেও নতুন বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশে এফডিআইয়ে খরা থাকলেও প্রতিযোগী দেশগুলো ঠিকই পাচ্ছে। বাংলাদেশ না পারলেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ এফডিআই পাচ্ছে ভারত,ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাচ্ছে।
একের পর এক ব্যাবসা বন্ধ হয়েছে, হচ্ছে,ছাঁটাই চলছে। মানুষ তাই বলে -চাকরি নেই,ব্যবসা নেই, আশা নেই! আছে শুধু ফাঁকা বুলি আর মিথ্যার বেসাতি।
Comments