ই-কমার্স খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও 'স্মার্ট ইকোনমি' বিনির্মাণে ৩০-দফা দাবি সনদ
*প্রেক্ষাপট: * সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বজেট আলোচনায় দেশের ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসা খাতের অস্তিত্ব রক্ষা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে *প্রধানমন্ত্রী* বরাবর এবং অবগতির জন্য *বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়* এবং *ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ* সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলে ৩০-দফা বিস্তারিত প্রস্তাবনা ও দাবি সনদ পেশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসা। বর্তমানে এই খাতের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা; যার সাথে সরাসরি জড়িত ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ২০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। সঠিক নীতিগত সহায়তা এবং কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত দেশের জিডিপিতে ৫%-এর বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিদ্যমান অর্থ আইন ও আয়কর আইনের কিছু জটিলতা এবং উচ্চ কর হারের কারণে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিশেষত নারী উদ্যোক্তারা বর্তমানে অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকটে পড়েছেন।
জাতীয় স্বার্থে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক 'স্মার্ট ইকোনমি' গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের কাছে পেশ করা আমাদের ৩০-দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও দাবি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কর ও আইনি কাঠামো সংস্কারের দাবি
* *ই-কমার্সকে পুনরায় ITES ভুক্ত করা: * অর্থ আইন ২০১৬ (৫৪-গ) সংশোধন করে ই-কমার্সকে পুনরায় আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস (ITES) ভুক্ত করতে হবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিতে হবে। এটি করা হলে আগামী ৫ বছরে এই খাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) ৫০০% বৃদ্ধি পাবে।
* *ন্যূনতম কর (Minimum Tax) যৌক্তিকীকরণ: * আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ অনুযায়ী লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ওপরও ০.১% থেকে ০.৬% ন্যূনতম কর ধার্য রয়েছে। স্টার্টআপদের টিকে থাকার হার ৪০% বাড়াতে লাভ করার আগ পর্যন্ত এই কর ০.১%-এ স্থির রাখতে হবে।
* *প্রচারণামূলক ব্যয় সীমা বৃদ্ধি: * আয়কর আইনের ধারা ৫৫-ক অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের ব্যয় সীমা টার্নওভারের মাত্র ০.৫% পর্যন্ত বৈধ। ব্র্যান্ডিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে এই সীমা বাড়িয়ে ৫% করতে হবে।
* *বাড়িওয়ালার রিটার্ন কপি জমার বাধ্যবাধকতা শিথিলকরণ: * আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বাড়িওয়ালার রিটার্ন কপি সংগ্রহ করতে হয়, যা প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে বিশেষ অব্যাহতি দিতে হবে।
* *অনলাইন রিটার্ন ও ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণ: * ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য এনবিআর-এর এক পাতার (Single Page) সহজ রিটার্ন ফর্ম চালু করতে হবে। এছাড়া সারাদেশে ই-কমার্স ক্যাটাগরিতে অভিন্ন ও সর্বোচ্চ ১,০০০ টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি।
২. ক্যাশলেস ইকোনমি ও ডিজিটাল ট্রানজেকশন সুবিধা
* *ডিজিটাল পেমেন্টে ভ্যাট রেয়াত: * নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনে ভ্যাট হার সমান হওয়ায় মানুষ ক্যাশলেস পেমেন্টে আগ্রহী হচ্ছে না। ডিজিটাল পেমেন্টে সরাসরি ৩%-৫% ভ্যাট রেয়াত বা ক্যাশব্যাক দিলে ক্যাশলেস লেনদেন ৩০% বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি বছরে ২০০ কোটি টাকা কমবে।
* *গেটওয়ে চার্জ সমন্বয়: * পেমেন্ট গেটওয়ের ১.৫% থেকে ৩% চার্জ উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে। এই চার্জে সরকার কর্তৃক ১.৫% সাবসিডি বা ইন্সেন্টিভ প্রদান করা উচিত, যা ব্ল্যাক মানি লেনদেন কমিয়ে অর্থনীতিকে ফরমাল করবে।
* *রিফান্ড অটোমেশন ও ব্যাংক চার্জ মওকুফ: * পেমেন্ট রিফান্ড প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল কমার্সে এখনো জটিল। রিফান্ড প্রসেস সম্পূর্ণ অটোমেশন করতে হবে এবং রিফান্ড ব্যাংক চার্জ সম্পূর্ণ মওকুফ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নারী উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক এফ-কমার্স ব্যবসার সুরক্ষা
* *নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ কর সুবিধা: * ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা করজালের জটিলতায় নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বার্ষিক ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার থাকা নারী উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হোক। এতে ২ লক্ষাধিক নারী মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হবেন।
* *DBID-এর মাধ্যমে ফাইন্যান্সিং: * ফেসবুক ভিত্তিক হাজারো উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্সের অভাবে লোন পাচ্ছেন না। ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন বা DBID থাকলেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লোন ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
* *জামানতবিহীন স্মার্ট লোন: * ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড দেখে ছোট, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ৫-১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করা হলে এই খাতে তাদের অংশগ্রহণ ৫০% বাড়বে।
৪. লজিস্টিকস, অবকাঠামো ও সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন
* *স্মার্ট লজিস্টিকসে শুল্ক সুবিধা: * লজিস্টিকস সর্টিং ও অটোমেশন যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান। এই শুল্ক শূন্য করা হলে পণ্য ডেলিভারি খরচ ২০% কমবে।
* *ডেলিভারি চার্জে ভ্যাট প্রত্যাহার: * ডেলিভারি চার্জের ওপর ১৫% ভ্যাট ক্রেতাকে অনলাইন বিমুখ করছে। নিজস্ব ডেলিভারির ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও ৩য় পক্ষের ক্ষেত্রে তা ৫% নির্ধারণ করা হোক।
* *অফিস ও গোডাউন ভাড়ার ভ্যাট মওকুফ: * ই-কমার্স ও লজিস্টিকস হাবের জন্য ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ১৫% ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করা হলে উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় ১০% কমবে।
* *ই-কমার্স জোন ও ভিলেজ: * ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে হাইটেক পার্কের মতো 'ই-কমার্স ভিলেজ' গঠন করা হোক।
* *জোগানদার ও মূসক অব্যাহতি: * প্রজ্ঞাপন (SRO ২৪০-আইন/২০২১) দ্বারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যেও জোগানদার হিসেবে উৎসে ভ্যাট কাটা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ রহিত করলে সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা আসবে ও পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে।
৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ
* *রপ্তানিতে ১০-১৫% নগদ প্রণোদনা: * ই-কমার্স রপ্তানিতে সফটওয়্যারের মতো স্পষ্ট নগদ সহায়তা নেই। সরাসরি ১০-১৫% নগদ প্রণোদনা ও সহজ শুল্কায়ন দিলে ২০২৭ সালের মধ্যে ই-কমার্স রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব।
* *বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা: * রপ্তানিমুখী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য 'বন্ডেড ওয়্যারহাউস' সুবিধা দিলে হস্তশিল্প ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে।
* *ডাক বিভাগে বিশেষ ছাড়: * আন্তর্জাতিক কুরিয়ার খরচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অসহনীয়। ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য বিদেশে পাঠাতে চার্জে ৫০% বিশেষ সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হোক।
* *আন্তর্জাতিক পেমেন্টে শিথিলতা: * ক্ষুদ্র পেমেন্টে পাসপোর্ট কপির বাধ্যবাধকতা থাকায় বৈশ্বিক ক্রেতারা বিমুখ হচ্ছেন। ১,০০০ ডলার পর্যন্ত লেনদেনে পাসপোর্ট কপির বাধ্যবাধকতা রহিত করা হোক।
* *এগ্রি-ই-কমার্স প্রণোদনা: * এগ্রি-উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কোল্ড চেইন সাবসিডি দিলে পচনশীল পণ্যের অপচয় ৩০% কমবে এবং কৃষক সরাসরি ন্যায্যমূল্য পাবে।
* *পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ে ভ্যাট ছাড়: * প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে পাটজাত বা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারে বিশেষ ভ্যাট ছাড় দিলে পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হবে।
### ৬. রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, শিক্ষা ও নিরাপত্তা
* *অনলাইন বিজ্ঞাপনে ভ্যাট হ্রাস: * দেশীয় প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনে ১৫% ভ্যাট থাকায় বিজ্ঞাপনের ৭০% টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ভ্যাট কমিয়ে ৫% করলে ৫০০ কোটি টাকার ফরেক্স বা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
* *ডিজিটাল কমার্স রিস্ক ফান্ড ও সাইবার ইনস্যুরেন্স: * সাইবার আক্রমণ বা ব্যবসায়িক বিপর্যয় থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে বাজেটে একটি বিশেষ 'রিস্ক ফান্ড' গঠন করা হোক। পাশাপাশি সাশ্রয়ী 'সাইবার রিস্ক ইনস্যুরেন্স' চালু করা প্রয়োজন।
* *দক্ষ জনবল ও ইনোভেশন ফান্ড: * কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় 'ডিজিটাল কমার্স ম্যানেজমেন্ট' বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নতুন আইডিয়া ও গবেষণার জন্য বাজেটে বিশেষ 'ইনোভেশন ফান্ড' গঠন করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের আহ্বান
উপরোক্ত ৩০-দফা দাবি কোনো একক বা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়; বরং এটি দেশের ৫ লক্ষ উদ্যোক্তা ও ২০ লক্ষ কর্মজীবীর বেঁচে থাকার এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রোডম্যাপ।
যেহেতু এই প্রস্তাবনাটি *মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ **অর্থ, বাণিজ্য, পরিকল্পনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের* নীতি-নির্ধারকদের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে, তাই আমাদের আকুল আবেদন—আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জাতীয় স্বার্থে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির বৃহত্তর কল্যাণে এই দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হোক। এই প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়িত হলে ই-কমার্স খাত শুধু নিজের পায়েই দাঁড়াবে না, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপিতে ৫%-এর বেশি অবদান রেখে একটি শক্তিশালী ও টেকসই 'স্মার্ট ইকোনমি' বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।
সোহেল মৃধা : ই-কমার্স বিশ্লেষক এবং ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর ফাউন্ডিং মেম্বার
Comments