বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভুলে না যাওয়ার আহ্বান ইউএনএইচসিআরের
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভুলে না যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও তাদের মানবিক সহায়তা অংশীদাররা। বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রতি যেন বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও অর্থায়ন কমে না যায়, সেই তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) জেনেভার পালে দে নাসিওঁ-এ আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ বলেন, 'চলতি বছর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণহারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার নয় বছর (২০১৭-২০২৬) পূর্ণ হচ্ছে। বর্তমানে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প ও ভাসানচরে বসবাস করছেন।'
ইউএনএইচসিআর জানায়, গত মাসে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘসহ সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা (হোস্ট কমিউনিটি) জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তার যৌথ আবেদন (জেআরপি) জানায়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চাহিদা বাড়লেও বাস্তবতার নিরিখে এই আবেদন গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম রাখা হয়েছে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অতিজরুরি আবেদনে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের ৬০ শতাংশ নিশ্চিত করেছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, শুধু ন্যূনতম এই সহায়তা দিয়ে সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
সংস্থাটির মতে, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সীমিত সম্পদের সঠিক বণ্টন কঠিন হয়ে পড়েছে, যা রোহিঙ্গাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জরুরি সেবাকে হুমকির মুখে ফেলছে। পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পেলে শরণার্থীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে এই সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, নিপীড়ন ও লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। উল্টো সেখানে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আরও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে।
মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তায় কাটছাঁটের কারণে রোহিঙ্গারা এখনও আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ এবং নতুন করে আসা শরণার্থীরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিজ দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ হওয়া এবং ক্যাম্পের বন্দিজীবনে উন্নত জীবনের আশা হারিয়ে অনেকে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালেই আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিসহ এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন।
ইউএনএইচসিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, মিয়ানমারে স্থায়ী শান্তি ও সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে হবে। একই সঙ্গে ত্রাণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা কমাতে শরণার্থীদের মর্যাদা রক্ষা এবং তাদের সীমিত পরিসরে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
Comments