হয়েও হচ্ছে না ইরান যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পথে প্রধান বাধাগুলোর একটি ছিল ইরানের ওপর জারি করা নৌ-অবরোধ। সেটি তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উভয়মুখী জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছেন তিনি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন।
এর পরই যুদ্ধ বন্ধ এবং ইরান-আমেরিকা চুক্তির পথে আশার আলো দেখছেন আন্তর্জাতিক মহল। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে এ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়।
এর আগে ইরান জানিয়েছিল, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করছে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, বৃহস্পতিবার দুই দেশ সমঝোতা স্মারক নামের একটি চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়েছে, যা ট্রাম্প ও ইরানের নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতি ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বর্তমানে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্রুত কোনো সমঝোতা হবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধবিরতি এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে এবং যেকোনো সময় আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। একইসঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফাভাবে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেওয়া। ওই চুক্তির আওতায় ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমিয়েছিল, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা সীমিত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নিয়েছিল। বিনিময়ে ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই চুক্তিকে "সবচেয়ে খারাপ চুক্তি" বলে বাতিল করেন। এখন বাস্তবতা হলো, নতুন যে কোনো সমঝোতাও শেষ পর্যন্ত অনেকাংশে সেই পুরোনো চুক্তির মতোই হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের "জিরো এনরিচমেন্ট" বা ইরানের সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব একশন ভেঙে যাওয়ার পর ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়বে না। ফলে আলোচনায় সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে-ইরান কতটুকু সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত।
এছাড়া অত্যধিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। তেহরান চায়, কোনো সমঝোতা হলে তার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা ও জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া হোক। কারণ অতীতে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ভেঙে দেওয়ার অভিজ্ঞতা ইরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে। ইরানের ধারণা, ওয়াশিংটন আলোচনাকে কৌশলগত ফাঁদ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও সুস্পষ্ট ও স্থিতিশীল অবস্থানের অভাব রয়েছে। কখনো কঠোর বক্তব্য, আবার কখনো আপসের ইঙ্গিত-এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান ইরানসহ মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ফলে আলোচনার পরিবেশ অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের পর ইরান প্রত্যাশার তুলনায় বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা ইরানের বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা তেহরানকে নতুন ধরনের প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। সামরিকভাবে দুর্বল হলেও ইরান অসম যুদ্ধকৌশল, সামুদ্রিক চাপ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
ইসরায়েল সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেল আবিব মনে করে, ইরানকে সীমিত হলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া বা আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে দেওয়া তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই ইসরায়েল চায়, যুক্তরাষ্ট্র এমন কঠোর শর্ত দিক যা ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। একইসঙ্গে লেবানন ও অন্যান্য স্থানে সামরিক চাপ বাড়িয়ে কূটনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল রাখার চেষ্টাও করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিও কূটনৈতিক অগ্রগতির বড় বাধা। তারা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও সামরিক চাপের পক্ষে কাজ করছে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো সমঝোতায় পৌঁছালেও তা টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সবশেষে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্ভাব্য সমঝোতা হলেও তা মধ্যপ্রাচ্যের গভীর সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পারস্পরিক অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রক্সি যুদ্ধ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বহাল থাকবে। অর্থাৎ, এই সমঝোতা মূলত তাৎক্ষণিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মূল কারণগুলো দূর করতে পারবে না।
Comments