“চট্টগ্রাম বন্দরে টেন্ডার বাণিজ্যের ‘রেটকোড ফাঁস, নেপথ্যে দুই প্রকৌশলী” শীর্ষক প্রতিবেদন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
১২ মে, ২০২৬ তারিখে ঢাকা জার্নাল-এ প্রকাশিত "চট্টগ্রাম বন্দরে টেন্ডার বাণিজ্যের 'রেটকোড ফাঁস, নেপথ্যে দুই প্রকৌশলী" শীর্ষক প্রতিবেদনটির ব্যাখ্যা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসে স্বাক্ষর করেছেন বন্দরের সচিব। নিচে তাদের ব্যাখ্যাটি তুলে ধরা হলো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারও অভিযোগ সূত্রের বরাতে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশলে তারা সরকারি ক্রয়নীতি পি পি আর-২০০৮ লঙ্ঘন করে আসছেন এবং বন্দরের প্রশাসনিক বিভাগের নীরবতায় সেসব অনিয়ম চলছে বছরের পর বছর।"
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, চবক এর নিজস্ব জাহাজ ও পন্টুন বার্জ নৌ-প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। চবক এর অপারেশনাল চাহিদার প্রেক্ষিতে অত্র বিভাগের ১২০০ টন, ৮০ টন ও ৫০ টন স্লিপওয়ের পাশাপাশি বাহিরের ডকেও নিয়মিত জাহাজ ও পন্টুন সমূহের ডকিং মেরামত কাজ করা হয়ে থাকে। যা PPRএর রুল অনুসরণ এবং Bangladesh Public Procurement Authority (BPPA) এর Standard Tender Documents (STD) অনুসরণ পূর্বক দরপত্র কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে; যা ব্যাপক প্রচারের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায়, চবক এর ওয়েব সাইট এবং প্রয়োজনবোধে BPPAএর ওয়েবসাইটে প্রচার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে পিপিআর ২০২৫ এর আলোকে দরপত্র সমূহ ই-জিপি পদ্ধতিতে SLT অনুসৃত হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজয়ী নির্বাচিত হয়ে থাকে বিধায় উপরোক্ত কর্মকর্তাদের আইন বহির্ভূত কর্মকান্ড সম্পাদন করা সম্ভব নয় ।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, 'অভিযোগের মূল চিত্রটি শুরু হয় টেন্ডারের আগেই। জানা গেছে, তারা ওটিএম ও ই-জিপি টেন্ডার পদ্ধতিতে পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গোপনে রেটকোড সরবরাহ করেন। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে এই তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হয়, ফলে ওই ঠিকাদাররা কাজের মূল্যসীমা আগে থেকেই জেনে যান এবং নিখুঁত দর দিয়ে টেন্ডার জিতে নেন। সাধারণ ঠিকাদাররা পে-অর্ডার ও সিডিউল কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ দুই কর্মকর্তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়'।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, দরপত্র এর প্রাক্কলন (রেটকোড) PPRএর নির্দেশনা অনুযায়ী ৩-৪ জন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সমন্বয়ে সম্পাদন করতঃ উর্দ্ধতন কর্মকর্তার নিকট গোপনে সংরক্ষিত থাকায় প্রাক্কলন (রেটকোড) ফাঁস করার সম্ভাবনা নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, তবে 'রেটকোড ফাঁসই তাদের একমাত্র কৌশল নয়। আরও জটিল ও অভিনব পদ্ধতি হলো দরপত্রের শর্তগুলোকে স্ববিরোধী ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তোলা। অভিযোগে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছোট কাজে বড় সনদ চাওয়া হয়, আবার বড় কাজে সেসব সনদ লাগে না। যেমন স্টোর রেক সম্পাদনের মতো নিতান্তই ছোট কাজের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবিসি সনদ, অথচ বন্দরের অনেক বড় উন্নয়ন কাজেও এই সনদ চাওয়া হয় না'।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, Racking Systemটি টুলস রুমে স্থাপন করা হবে। Racking System টি অত্যাধুনিক Cantilever, Mezzanine System হবে। এর আশে পাশে ইঞ্জিন রিপেয়ার শপ ও মেশিন শপ এবং ইলেকট্রিক ওভার হেড ক্রেন আছে। Racking System স্থাপন করার সময় ওয়েল্ডিং এবং Ground Floor এর সাথে Nut-Bolt Fitting এর কাজ রয়েছে বিধায় ইলেট্রিক্যাল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সার্টিফিকেট থাকলে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা পরিহার করা সম্ভব। ইতিপূর্বে এধরনের কাজ করতে গিয়ে নৌ-প্রকৌশল বিভাগের অভ্যন্তরে অগ্নি দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে উল্লেখ্য, উক্ত প্রতিবেদনটি পত্রিকায় প্রকাশের পূর্বেই ০৭/০৫/২০২৬ ইং তারিখে দরপত্রে অধিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ABC Certificate টি দরপত্র যোগ্যতা সংশোধন পূর্বক Amendment দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, একই চিত্র দেখা যায় আইএসও সনদের ক্ষেত্রে। পন্টুন বার্জ-২০ নামের একটি ছোট মেরামতের কাজে আইএসও সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিন্তু পল্টুন বার্জ-২ এর কাজে মেরামতে কাজে তেমন শর্ত আরোপ করে নাই।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, চবক এ ৩৯ টি পন্টুন রয়েছে। এগুলো ডকিং মেরামত করার জন্য চবক এর একটি ৮০টন ক্ষমতা সম্পন্ন স্লিপওয়ে রয়েছে। বর্তমানে স্লিপওয়েটি খালি না থাকায় পন্টুন বার্জ-২০ মেরামত অত্যাবশ্যকীয় হওয়ায় বাহিরের ডকে ডকিং মেরামত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রশাসনিক অনুমোদন পূর্বক ই-জিপিতে উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করা হয়। যেহেতু বাহিরের ডকে ডকিং করা হবে Under Water Hall Plate, Transom এর মেরামত কাজ হবে সেহেতু যথাযথ সেফটি ও সিকিউরিটি এবং কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে নিজস্ব ডক ও ISO Certificate ship repair work চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ISO Certificate ship repair work এবং নিজস্ব ডকধারী বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ই-জিপি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ব্যাপক প্রতিযোগিতার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, উক্ত প্রতিবেদনটি পত্রিকায় প্রকাশের পূর্বেই ১০/০৫/২০২৬ ইং তারিখে দরপত্র বেশী প্রতিযোগিতা হওয়ার জন্য দরপত্র যোগ্যতা সংশোধন পূর্বক ISOCertificate (যদি থাকে) এবং ডক ভাড়া অথবা লীজ নেওয়া যাবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আবার ছোট আকারের জরিপ স্টিয়ারিং সিস্টেম উইঞ্জ মেরামত ও জরিপ-১০ ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের মতো কাজে আবশ্যক করা হয়েছে পিওএমএমডি সার্টিফিকেট ও ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি), অথচ মেরামতের অনেক বড় কাজেও এসব ডকুমেন্ট লাগে নাই স্থানীয় ডিলারের পণ্য সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে এসব সনদ লাগে না। এই অসঙ্গতি শুধু একটি-দুটি কাজে নয়, বন্দরের নৌ-প্রকৌশল বিভাগের প্রায় প্রতিটি দরপত্রেই ছড়িয়ে আছে। একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় জরিপ ১০ জাহাজ মেরামত সংক্রান্ত কাজগুলোতেও। কান্ডারি-৭ পপুলার শেফট মেরামত ও মালামাল সরবরাহ কাজের জন্য এক ধরনের সহজ শর্ত থাকলে, একই স্থানের জরিপ ১০ ডকিং মেরামতের কাজে আরেক ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। কাজের প্রকৃতি ও মিল থাকলেও শর্তের মধ্যে কোনো সঙ্গতি রাখা হয় না।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, জরিপ -১০ জাহাজটিতে মূল্যবান জরিপ কাজে ব্যবহৃত মাল্টি বিম ইক্যু সাউন্ডার আছে, যা কান্ডারি-৭ জাহাজ বড় হলেও তাতে নেই। ডকিং মেরামত কাজের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় এবং কাজটি মেজর ডকিং হওয়াতে POMMD Certificate প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে POMMD Certificate ধারী বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ই-জিপি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ব্যাপক প্রতিযোগীতার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, উক্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশের পূর্বেই ১০/০৫/২০২৬ ইং তারিখে দরপত্র বেশী প্রতিযোগিতা হওয়ার জন্য দরপত্র যোগ্যতা সংশোধন পূর্বক POMMD Certificate (Joint Venture)বং IRCCertificate (যদি থাকে) মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হলো, গত বছর প্লেট সরবরাহ ও গেট বাল্ব সরবরাহের এক টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে না পেরে সম্পূর্ণ দরপত্র বাতিল করে নতুন করে শর্ত সাজিয়ে সেই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকেই কাজটি তুলে দেওয়া জন্য ম্যানুয়াল টেন্ডার আহব্বান করা হয়। ঠিকাদারদের ভাষায়, এভাবে তারা নিজেরাই একটি সুসংহত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অভিযোগের আরেকটি দিক হলো অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও নানা কারসাজি। জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্যাদেশে একক ওয়ার্ক অর্ডারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই। পিপিআর আইনে যা বাধ্যতামূলক নয়, অথচ কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো শর্ত সংযোজন ও বিয়োজন করেন। তারা ই-টেন্ডারের সঙ্গে অতিরিক্ত নথিপত্র হিসেবে এবিসি সনদ দাখিলের নির্দেশ দিচ্ছেন ছোট কাজে, যেখানে যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। এই অভিযোগ এতটাই জোরালো যে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহ্বানকৃত টেন্ডারগুলোর শর্ত সহজীকরণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, পিপিআর ২০০৮ এর বিধি অনুসারে দরপত্র আহবানের প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় পিপিআর ২০২৫ গেজেট প্রকাশ হয়। এই টেন্ডারটি OSTEM পদ্ধতিতে থাকায় পিপিআর ২০২৫ এ OSTEM দরপত্র সিডিউল Configure করা সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে উপ-ভান্ডারে MSPlate মজুদ শূন্য হওয়ায় এবং ডকিং করা জাহাজ কান্ডারী-৭ এ Plate প্রয়োজন হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে HOPE কর্তৃক অনুমোদন নিয়ে BPPA কর্তৃক বিভিন্ন শর্তস্বাপেক্ষে Manual পদ্ধতি OSTEMএর মাধ্যমে করার জন্য অনুমোদন প্রাপ্ত হয়ে দরপত্রটি আহবান করা হয়। যাবতীয় শর্তাবলী ই-জিপি পদ্ধতিতে যা ছিল তা Manual পদ্ধতিতেও বলবৎ আছে।Manual পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করা হলেও পিপিআর ২০২৫ অনুয়ায়ী Financial Evaluationইজিপি পদ্ধতিতে SLT করার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এ সব অনিয়মের পরও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। বছরের পর বছর ধরে ঠিকাদাররা উচ্চ মহলে অভিযোগ জানালেও সেগুলো আমলেই নেওয়া হয় না। তদন্তের নাম নেই, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তো প্রশ্নই ওঠে না। হতাশ ঠিকাদারদের একাংশ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নজর দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কিছু পলাতক ঠিকাদারকেও নানা কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যার সত্যতা যাচাই জরুরি।
এ বিষয়ে চবক এর বক্তব্য হলো, চবক এর বিভিন্ন দরপত্র কার্যক্রম নিরীক্ষা করার জন্য চবক এর নিজস্ব দক্ষ কর্মকর্তাদের স্বমন্বয়ে একটি নিরীক্ষা বিভাগ রয়েছে। তাছাড়াও, প্রতি অর্থ বছর শেষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর পরিবহন অডিট অধিদপ্তর, সেগুনবাগিচা, ঢাকা কর্তৃক প্রেরিত অডিট টীমের মাধ্যমে মাসব্যাপী সরেজমিনে দরপত্র সমূহের নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে।
Comments