নীলফামারীতে বোরো ক্ষেতে পাতামরা রোগে দিশাহারা কৃষক
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে চলতি মৌসুমে মাঠে মাঠে ইরি-বোরো ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতামোড়া (বিএলবি) রোগ। যে মাঠে গাঢ় সবুজ পাতার মিতালিতে সোনালি ধানের আভায় ভরে ওঠার কথা। অথচ সে মাঠের সবুজ পাতাপুড়িয়ে বিবর্ণ (তামাটে) রঙ ধারণ করেছে। এক জমি থেকে অন্য জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এ ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতামোড়া রোগ। এতে করে ফলন বিপর্যয়সহ একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগে প্রতিকার না মেলায় বোরো চাষিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অপরদিকে এ আপৎকালে মাঠ পর্যায়ে ব্লক সুপার ভাইজারদের দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকায় এ রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকারেও মিলছে না কোনো সঠিক পরামর্শ। সব কিছু মিলে বোরোচাষিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
মাঠে কৃষি সেবা না পাওয়ার এমন জোরালো অভিযোগ কৃষকদের। তারা নিরুপায় হয়ে ঘাম আর শ্রমে ফলানো কষ্টের ফসল বাঁচাতে ছুটছেন কীটনাশক ব্যবসায়ীদের কাছে। তাদের পরামর্শে হাজার হাজার টাকার কীটনাশক সংগ্রহ ও একাধিকবার প্রয়োগ করেও সুফল মিলছে না। এতে করে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় ক্ষুদ্র-প্রান্তিক বোরোচাষিরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। রোগ দমনে সঠিক পরামর্শ না পেয়ে অনেক কৃষক ভুল কীটনাশক প্রয়োগ করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে ১১ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিডসহ বিভিন্ন জাতের ধান চাষ হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের হাড়ভাঙ্গা যত্নআত্তিতে বোরো ক্ষেত সবুজ সমারোহে ভরে ওঠা দেখে কৃষকের কাছে খুশির বার্তা নিয়ে আসে। আর মাঠের প্রতিটি গাছ থেকে ধানের শীষ বেরিয়ে আসায় মনে হয় যেন সবুজের গালিচায় লেগেছে সোনার মোহর। কিন্তু এসব মাঠে হঠাৎ করে দেখা দেয় ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতামোড়া রোগ। ধানের শীষ বের হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ রোগে ধান গাছের প্রতিটি সবুজ পাতা আগা থেকে শুকিয়ে ধীরে ধীরে পুরো গাছ বিবর্ণ (তামাটে) রঙ ধারণ করেছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আগাছানাশক দিয়ে পুরো ক্ষেত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া ও জয়নোন কোট ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেতে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
কোর্ট ব্লকের পাশাপাশি পশ্চিমপাড়া ব্লকে দেখা গেছে, আবদুল জব্বারের ১২০ শতাংশ, এমদাদুল হকের ৩০ শতাংশ, শামসুল হকের ৩০ শতাংশ, মোখলেছার রহমানের ৬০ শতাংশ জমিসহ আরো অনেক কৃষকের জমিতে ব্যাপকহারে ওই রোগে পাতা পুড়ে যাচ্ছে।
এসব কৃষকের পাশাপাশি বোরোচাষি শামসুল হক বলেন, ধানের শীষ বের হওয়ার পর হঠাৎ করেই সবুজ পাতা আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ঝলসিয়ে পুরো ধানক্ষেত পোড়া রঙ ধারণ করেছে।
কৃষি অফিসের কাউকে না পেয়ে দোকানদারের পরামর্শে দেড় হাজার টাকার নেটিভ ক্রপ কোম্পানির কপাল-৭৩ ডব্লিউ পিসহ হাইছেম কোম্পানির ব্যাকট্রোবান-২০ ডব্লিউ পি কীটনাশক ক্রয় করে একাধিকবার প্রয়োগ করেও কোনো প্রতিকার হয়নি। এ অবস্থায় অর্ধেকের বেশি ফলন পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই আপৎকালে কোনো কৃষি কর্মকর্তা বা বিএসের দেখা নেই। আমরা পরামর্শহীন অবস্থায় দিশাহারা হয়ে পড়েছি। এভাবে ধান নষ্ট হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে চলা খুবই কষ্টকর হবে।
অপরদিকে কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মধ্যরাজিব চেংমারী ব্লকের বোরোচাষি জিকরুল হক বলেন, এবার আমি ১২০ শতাংশ জমিতে জনগাছ হাইব্রিড জাতের ধানের চাষ করেছি।
ধানের শীষ বের হওয়ার পর পুরো ক্ষেত পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ধান রক্ষায় দিশাহারা হয়ে পড়েছি। এমন আপৎকালীন মুহূর্তে মাঠ পর্যায়ে কোনো ব্লক সুপারভাইজারদের পাশে না পাওয়ায় কোনো পরামর্শ পাওয়া যায়নি।
ফলে বাধ্য হয়ে কীটনাশক ব্যবসায়ীদের পরামর্শে দুবার বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ ছিটিয়ে কোনো প্রতিকার মিলেনি।
একই ব্লকের কৃষক আজিজার রহমান এবার ১১ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো চাষ করেছেন। কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মধ্যরাজিবের বিএস বা কায় তাক হামরা চিনিও না। এখানে আইসেও না।
আমার ক্ষেতে পাতামোাড়া, গোড়া পচাসহ নেক ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। নেকব্লাস্ট রোগে ধানের শীষের গোড়ায় পচন ধরে কচি শীষ মরে চিটা (সাদা) হয়ে যাচ্ছে।
দোকানদারের পরামর্শে দুইবার এক হাজারের বেশি টাকার কীটনাশক ছিটিয়ে কোনো ফল হয়নি। এতে করে অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনেকাংশে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমার পার্শ্ববর্তী জমিতে আরো অনেক কৃষকের জমিতে এমন রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। পরামর্শহীনভাবে এভাবে ধান নষ্ট হয়ে গেলে কৃষক পরিবার তথা দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে। তাই এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কৃষি কর্মকর্তার সুদৃষ্টি কামনা করছি।
মাঠ পর্যায়ে ব্লক সুপারভাইজারদের (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) অনুপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, গত কয়েক দিন আগে ঝড়-বৃষ্টি ছিল,এ কারণে কিছু জমিতে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতামোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কিছু জায়গায় এ রোগের জন্য আমরা কৃষকদের দস্তা,পটাশ, সালফার প্রায়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছি। গতকালকে আমি বড়ভিটা ইউনিয়নে দুটি জায়গায় ৫০, ৫০ জন মিলে ১০০ কৃষককে নিয়ে গ্রুপ মিটিং করেছি। এ মিটিং বিভিন্ন জায়গায় অব্যাহত আছে। কৃষকদের মাঝে লিফলেট ও প্রেসকিপশন বিতরণ করছি। আশা করা হচ্ছে আবহাওয়া ভালো থাকলে নতুন করে এ রোগের আক্রমণ দেখা যাবে না।
Comments