'তাপপ্রবাহে ৯৭% সক্ষমতায় রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাতীয় গ্রিডের বড় ভরসা'
তীব্র তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা যখন বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে, তখন বাগেরহাটের রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থেকে জাতীয় গ্রিডে বড় অবদান রেখেছে। গত এপ্রিল মাসে কেন্দ্রটি ৭৬০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা চালুর পর এক মাসে অন্যতম সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের ডলার সংকট ও কয়লা আমদানির জটিলতা কাটিয়ে ওঠা এবং দক্ষ জনবল কাঠামোর কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলেই এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে কেন্দ্রটি মোট পাঁচবার এক মাসে ৭০০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৭৭২ মিলিয়ন ইউনিট এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৭৬৯ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি ও মার্চ মাসেও উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন ইউনিটের ঘর ছাড়িয়েছিল।
তবে এপ্রিলের গুরুত্ব ছিল আলাদা। এ সময় তাপমাত্রার পারদ ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করায় জাতীয় গ্রিডে রেকর্ড ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই চরম সংকটের মুখে রামপাল কেন্দ্রটি তার সক্ষমতার প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সচল থেকেছে এবং পুরো মাসজুড়ে গড়ে ৮০ শতাংশ সক্ষমতা বজায় রেখেছে। অথচ ২০২৩ সালজুড়েই এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান বাধা ছিল ডলারের অভাব এবং ঋণপত্র বা এলসি খুলতে না পারা। কয়লা সংকটে তখন কয়েক দফা উৎপাদন বন্ধও রাখতে হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিআইএফপিসিএল এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কয়লা আমদানির জন্য পেমেন্ট মডেলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে ডলার সংস্থানের একটি বিশেষ চ্যানেল তৈরি করায় ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পরিশোধ সহজ হয়েছে। এর ফলে গত কয়েক মাসে প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন কয়লা খালাস করা হয়েছে এবং বর্তমানে কেন্দ্রে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি মজুদ রয়েছে। এই জরুরি মজুদ বা 'বাফার স্টক' থাকার কারণেই এপ্রিলে কোনো যান্ত্রিক বিরতি ছাড়াই রেকর্ড উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
এই মেগা প্রকল্পের অন্যতম প্রাপ্তি হলো এর পরিচালনা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন। শুরুতে কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য ভারতীয় প্রকৌশলীদের ওপর প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভর করতে হলেও এখন চিত্রটি ভিন্ন।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পূজারী জানান, বর্তমানে কেন্দ্রটির পরিচালনা এখন অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার হাতে।
রমানাথ পূজারী বলেন, "বর্তমানে একদল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি প্রকৌশলীই এই প্রকল্পের দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন। ভারতের এনটিপিসি এখন মূলত উপদেষ্টা হিসেবে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।"
বাস্তব চিত্র বলছে, গত এক বছরে নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ জন বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে তৈরি করা হয়েছে, যারা এখন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে শুরু করে টারবাইন হল—প্রতিটি স্পর্শকাতর ধাপ সফলভাবে সামলাচ্ছেন।
সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় কেন্দ্রটি নিয়ে শুরু থেকেই পরিবেশগত উদ্বেগ ছিল। তবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সেখানেও কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখা হচ্ছে। এখানে ব্যবহৃত আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কারণে কয়লার দহন ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনি ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনির মাধ্যমে ধোঁয়া নির্গমন এবং ফ্লু গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন (এফজিডি) প্রযুক্তির ফলে ক্ষতিকর উপাদানের নির্গমন আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও নিচে রাখা হচ্ছে।
রামপালের সিনিয়র সাংবাদিক এম এ সবুর রানা বলেছেন, রামপাল এখন কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি জাতীয় গ্রিডের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভোল্টেজ স্বাভাবিক রাখতে এবং অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে কেন্দ্রটি অপরিহার্য। এপ্রিলের সেই চরম সংকটের দিনে যদি রামপাল জাতীয় গ্রিডে ৯ শতাংশের বেশি জোগান দিতে ব্যর্থ হতো, তবে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
Comments