অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অর্থনীতি: সংকট সামাল, গতি অনুপস্থিত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল, তাকে 'নাজুক' না বললেও, ভালো ছিল বলা যাবেনা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতা-সব মিলিয়ে অর্থনীতি ছিল এক বহুমাত্রিক চাপের মুখে। প্রশ্ন হলো, দেড় বছর পর আমরা কী দেখছি? অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, নাকি শুধু পতন ঠেকানো গেছে?
শুরুতেই স্বীকার করতে হবে, অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সাফল্য। ক্ষমতা গ্রহণের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ-যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে, নতুন টাকা ছাপানো বন্ধ রাখে, ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়িয়ে তা কমাতে চেষ্টা করেছে। ফলাফল হিসেবে সর্বশেষ ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
কিন্তু এই অর্জন কি সন্তোষজনক? না, তা বলা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় কঠোর নীতি চালিয়েও মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ৮ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চমাত্রার মধ্যেই পড়ে। নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রতিফলন স্পষ্ট-আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা সরকারের দুর্বলতার জায়গা হিসেবেই থেকে গেছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর। বিশ্বব্যাংক-এর তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এখন ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়া-অর্থাৎ মানুষের হাতে টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস-এই প্রবণতার প্রধান কারণ।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বিনিয়োগে স্থবিরতা। উচ্চ সুদের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারিয়েছেন। দেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন অনুকূল পরিবেশের জন্য। কিন্তু ইউনুস সরকারের পুরো শাসনামলেই ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, মব সন্ত্রাস ও আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি। এসব দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনি। বিনিয়োগ বোর্ড প্রধান লম্ফঝম্পে রেকর্ড করলেও নিজের প্রধান যে কাজ বিনিয়োগ বাড়ানো, তা করতে পারেননি। ফলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব চাকরির বন্যা বয়ে যাবে বললেও, বাস্তবে মানুষ চাকরি পায়নি, বরং খুইয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব ছিল। নীতি নির্ধারণে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও নিরুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের শেষে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশের বেশি। রাজনৈতিক চাপ তুলনামূলক কম থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব হতাশাজনক। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি-সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।
তবে সব চিত্রই যে নেতিবাচক,তা নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। মূলত প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধিই এর পেছনের প্রধান কারণ। এছাড়া মূলধন, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালসহ আমদানি কমে যাওয়ায় ডলার খরচ হয়েছে কম। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বাজার থেকে ডলার কিনে কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো ও মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে, কিন্তু গতি ফেরাতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আংশিক সফল,দারিদ্র্য বেড়েছে,বিনিয়োগ স্থবির,ব্যাংক খাত দুর্বলই থেকে গেছে্। ইতিবাচক দিক হিসেবে রিজার্ভ বৃদ্ধি থাকলেও তা একা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
এখন প্রয়োজন নীতিগত ভারসাম্য। কেবল সংকোচন নয়,উৎপাদন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা,আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়বে। জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার টেকসই হয় না। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আসা নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ-সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করা।
Comments