নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার সমূহ
নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলে দিশেহারা। দেশ ঋণের বোঝায় জর্জরিত, কোষাগারে টানাপোড়েন, রাজস্ব আদায় দুর্বল। উচ্চ সুদের চাপে বিনিয়োগ স্থবির, কারখানায় ছাটাই ও বন্ধের নোটিশ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির ভারে সাধারণ মানুষ ন্যুব্জ; ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-সব ধরনের ব্যবসাই নিজেকে অবহেলিত মনে করছে।
আস্থাহীনতার অর্থনীতি
গত দেড় বছরে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিকঅনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্বচ্ছতায় বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত থাকে। ফলে অর্থনীতির চাকা প্রত্যাশিত গতিতে ঘোরেনি। এখন অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তন আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং উদ্যোক্তাদের আবার বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
কাঠামোগত সংস্কারের অনিবার্যতা
শুধু প্রচলিত সংস্কার যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত রূপান্তর। সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা গেলে ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে, খেলাপি সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা ও সুশাসন জোরদার করা হলে তারল্য সংকট কমবে এবং আমানতকারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
ব্যবসা শুরুর ও পরিচালনার খরচ কমাতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন ও পেপারলেস ব্যবস্থার বিকল্প নেই। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে আইনি সুরক্ষা ও যৌক্তিক কর প্রণোদনা জরুরি। শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও মূল্য স্থিতিশীলতা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বাজারে ভারসাম্য ফিরতে পারে।
রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের করজিডিপি অনুপাত অন্যতম নিম্ন। করের হার বাড়ানোর বদলে করজাল সম্প্রসারণ বেশি কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি মেগা প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে কঠোর নজরদারি এবং ব্যয় যুক্তিকরণ বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ
পুঁজিবাজারে কারসাজি ও অনিয়ম রোধ করে বিশ্বাসযোগ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। কর প্রশাসন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ জোরদার হবে। স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি বহুমুখীকরণ অত্যাবশ্যক। আইটি ও সফটওয়্যার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাতে বিশেষ প্রণোদনা দিলে রপ্তানি ঝুড়ি বিস্তৃত হতে পারে।
১০০ দিনের জরুরি রোডম্যাপ
নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই একটি জরুরি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা প্রয়োজন। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ঘাটতি ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নএসব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জবাবদিহিমূলক শাসন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম প্রশাসনই পারে আস্থার সংকট দূর করতে। অর্থনীতির ইঞ্জিন আবার সচল করতে এখন সময় সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপের।
Comments