বড় দুই দলের ইশতেহার বাস্তবতা বিবর্জিত ও উচ্চাভিলাষী: সুজন
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারকে "বাস্তবতা বিবর্জিত ও অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী" বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি বলেছে, জামায়াত ও বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হতে হলে সবার আগে সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে এসব প্রতিশ্রুতি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সোমবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত 'কোন দলের কেমন ইশতেহার?' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
ইশতেহারের তুলনামূলক মূল্যায়ন
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন দলের ইশতেহারে উন্নয়নের কথা থাকলেও পথ ও দর্শন ভিন্ন। বিএনপি বাজারভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছে। এনসিপি ভবিষ্যতমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি, যুব কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল শিল্পকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। সিপিবি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সমাজতান্ত্রিক পুনর্বণ্টনের কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। জামায়াত উচ্চ প্রবৃদ্ধির আধুনিক কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলেছে।
সুজন মনে করে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়-বৈষম্য ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা। কিন্তু দলগুলোর ইশতেহারে এসব সমস্যার টেকসই সমাধানের রূপরেখা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও জিও-পলিটিক্সে দুর্বলতা
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে-বিএনপি সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কথা বলেছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক সংহতির ওপর জোর দিয়েছে এনসিপি বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ইশতেহারগুলোতে জিও-পলিটিক্স ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত।
আর্থিক প্রাক্কলনের ঘাটতি
সুজন বলেছে, সব দলের ইশতেহারের বড় দুর্বলতা হলো কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে তার স্পষ্ট হিসাব নেই। ফলে নাগরিকদের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহার: সুশাসন ছাড়া অসম্ভব
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জামায়াতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, করের আওতা বাড়াতে হবে, সরকারি নিয়োগ ও ক্রয়ে মেধাতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমাতে হবে। তা না হলে কর কমিয়ে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।
বিএনপির প্রতিশ্রুতি ব্যয়বহুল ও অস্পষ্ট
বিএনপির ইশতেহারের কয়েকটি বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুজন। এর মধ্যে- ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ।
এসব পরিকল্পনাকে "অত্যন্ত ব্যয়বহুল" উল্লেখ করে সুজন বলেছে, কৃষক কার্ডের ভর্তুকির পরিমাণও স্পষ্ট নয়। ফলে প্রকৃত রাজস্ব ব্যয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া ধনীদের করের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয়েছে।
সুজন বলেছে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয় এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও নীতিগত দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কোন দলের দর্শন বাস্তবে রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
Comments