সূর্যের ভবিষ্যৎ দেখাচ্ছে মহাকাশের ‘ঈশ্বরের চোখ’
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (জেডব্লিউএসটি) কল্যাণে এবার মহাকাশের অতি পরিচিত এক বস্তুর অবিশ্বাস্য ও বিস্তারিত ছবি হাতে পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। নতুন এই ছবিতে দেখা মিলেছে 'হেলিক্স নেবুলা' বা হেলিক্স নীহারিকার। এর বলয় আকৃতির কাঠামোর কারণে একে মহাকাশ বিজ্ঞানের ভাষায় 'ঈশ্বরের চোখ' নামেও ডাকা হয়।
মৃত্যুপথযাত্রী একটি নক্ষত্রের ওপরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে এই 'হেলিক্স নেবুলা'। নক্ষত্রটি তার বাইরের অংশগুলো হারিয়ে ফেলার পর এর কেন্দ্রটি সংকুচিত হয়ে একটি ঘন অবশিষ্টাংশে পরিণত হয়, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'হোয়াইট ডোয়ার্ফ' বা শ্বেত বামন।
মূলত সূর্যের সমান ভরের নক্ষত্রগুলোর কেন্দ্রে যখন হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন সেগুলো আর নিজের মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রবল চাপ সামলে রাখতে পারে না। তখনই নক্ষত্রটির মৃত্যু ঘটে এবং শ্বেত বামন হিসেবে এর অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকে। এই মৃত নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার আস্তরণকে বলা হয় 'প্ল্যানেটারি নেবুলা' বা গ্রহীয় নীহারিকা। যদিও নামের সঙ্গে 'প্ল্যানেটারি' বা গ্রহ শব্দটি যুক্ত, তবে বাস্তবে গ্রহের সঙ্গে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই হেলিক্স নীহারিকার বিস্তারিত দৃশ্য বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশেষ বার্তাবহ। কারণ, এটি আমাদের সূর্য সম্পর্কেও আগাম ধারণা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর যখন সূর্যের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে আসবে, তখন আমাদের নক্ষত্রটিরও ঠিক এমন দশা হবে। তাই টেলিস্কোপের লেন্সে এই নীহারিকাটিকে দেখতে রঙিন 'লাভা ল্যাম্পের' মতো মনে হলেও, এটি আসলে আমাদের সৌরজগতের ভবিষ্যতের এক 'ক্রিস্টাল বল' বা ভাগ্য গণনার আয়না, যা এক মহাজাগতিক ধ্বংসলীলারই পূর্বাভাস দিচ্ছে।
হেলিক্স নীহারিকা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এনজিসি ৭২৯৩ (NGC 7293) বা ক্যালডওয়েল ৬৩ (Caldwell 63) নামেও পরিচিত। ১৮২৪ সালের আগে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল লুডভিগ হার্ডিং এটি প্রথম আবিষ্কার করেন। পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান উজ্জ্বলতম এবং নিকটতম গ্রহীয় নীহারিকাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
আবিষ্কারের পর থেকেই হেলিক্স নীহারিকা বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে। বিখ্যাত হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ অসংখ্য শক্তিশালী টেলিস্কোপে বিভিন্ন সময়ে এর ছবি ধরা পড়েছে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি)। টেলিস্কোপটির অত্যাধুনিক 'নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরা' বা নিরক্যামের কারণে অবলোহিত রশ্মিতে ধরা পড়েছে এই নীহারিকার এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
জেমস ওয়েবের এই ছবিতে হেলিক্স নীহারিকার কেন্দ্রে থাকা সেই 'শ্বেত বামন' বা মৃত নক্ষত্র থেকে নির্গত প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তীব্র গতির এই গরম বাতাস যখন নক্ষত্রটির আগে ঝেড়ে ফেলা ঠান্ডা গ্যাস ও ধূলিকণার আস্তরণে সজোরে আঘাত করছে, সেই দৃশ্যটিও এতে নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে। এর মাধ্যমে মহাকাশের এই ব্যবস্থার মধ্যে থাকা প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাস এবং শীতলতম অংশের মধ্যকার এক বৈপরীত্য বা স্পষ্ট বিভাজন রেখা বিজ্ঞানীদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
জেমস ওয়েবের এই ছবিতে হেলিক্স নীহারিকার কেন্দ্রে থাকা সেই উত্তপ্ত শ্বেত বামন নক্ষত্রটিকে সরাসরি দেখা না গেলেও এর প্রভাব স্পষ্ট। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই মৃত নক্ষত্রটি থেকে প্রতিনিয়ত যে শক্তিশালী বিকিরণ নির্গত হচ্ছে, তার প্রভাবেই চারপাশের গ্যাসীয় মণ্ডল আলোকিত হয়ে উঠছে। এই বিকিরণ গ্যাসকে উত্তপ্ত করছে এবং সেগুলোকে আয়নিত করে তুলছে।
মৃত নক্ষত্রটির অবশিষ্টাংশ থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে ঠান্ডা আণবিক হাইড্রোজেনের ধূলিকণা বা 'ডাস্ট পকেট'। সেখানে পরিবেশ এতটাই অনুকূল যে জটিল অণু গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই উপাদানগুলোই হয়তো একদিন নতুন কোনো গ্রহ, এমনকি প্রাণের কারিগর বা 'বিল্ডিং ব্লক' হিসেবে কাজ করবে। সেই হিসেবে, এই মহাজাগতিক ক্রিস্টাল বলটি যেমন ভবিষ্যতের ধ্বংসলীলার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি কোটি কোটি বছর আগে আমাদের সূর্য ও সৌরজগৎ গঠনের আদি ইতিহাসকেও সামনে নিয়ে আসে।
Comments