ফিলিস্তিন প্রশ্নে অমানবিক বিশ্ব নিরবতা
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে আজ ৭ এপ্রিল সোমবার বিশ্বব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নাম দেয়া হয়েছে,'দ্যা ওয়ার্ল্ড স্টপস ফর গাজা'। এই ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল এবং ইসলামিক ফোর্সেস গ্রুপ, যা ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি ও ইসরায়েলি হামলার কারণে ক্রমবর্ধমান মৃত্যু সংখ্যা তুলে ধরা এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য স্থানীয় ও বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করা। বাংলাদেশেও ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালন করছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া ও শিক্ষকরা।
সভ্য দুনিয়ার দাবিদার সবার চোখের সামনে গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল। কিন্তু কাজ বন্ধ করা, প্রতিবাদ করা, দোয়া করা এসবের মাধ্যমে কি গাজার নিরীহ মানুষদের রক্ষা করতে পারছে? পারছে না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার ফিলিস্তিনের মানুষ।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর পরই বিশ্ব পরিমন্ডলে দু'টি বড় কাজের কথা বলেছিলেন। একটি হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো। দ্বিতীয় আকাঙ্খা ছিল গাজা খালি করা। তৃতীয় আরেকটি বিষয়ও এখন অতি সামনে। ট্রাম্প চাচ্ছেন ইরানের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে।
২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর আগে থেকেই যা চলছিল তাতে আরও গতি ফিরে আসে। আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে লেবাননের হিজবুল্লার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। হামাসকে হঠকারিতায় উস্কানি দিয়ে তাকে এবং ফিলিস্তিনিদের নিঃশেষ করে দেয়া, ইয়েমেনের হুতিদের উপর্যুপরি আক্রমণ করে মার্কিন জাহাজে আক্রমণের প্রতিশোধ নেয়ার কাজগুলো জোরালো করেছে মার্কিন প্রশাসন।
ইসরায়েল হচ্ছে পশ্চিমা সম্প্রসারণবাদের সবচেয়ে নিষ্ঠুর লাঠিয়াল। ইসরায়েল টিকেই আছে আমেরিকা এবং ইউরোপের স্বার্থে। কাজেই আমেরিকান এবং ইউরোপিয়ান আধিপত্য থাকলে ইসরায়েলও থাকবে। পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক তো বটেই, এর সাথে জড়িয়ে আছে তাদের রাজনৈতিক এবং আদর্শগত স্বার্থও। স্বার্থের কারণেই ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আমেরিকা ইউরোপের মদদ ছাড়া ইসরায়েল এতবড় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার সাহস কখনোই পেত না।
অর্থনৈতিক বিষয়টা বিশাল। ইসরায়েলিরা তথা ইহুদিরা আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে নানাদিক থেকে। ইহুদিদের প্রচুর টাকা, তাই তারা জুইশ লবিগুলোর মাধ্যমে আমেরিকার রাজনীতি ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে। এর সাথে যোগ হয়েছে আদর্শ। ইসরায়েলের আদর্শ আমেরিকানদের স্বার্থের পক্ষে যায় বলেই আমেরিকানরা নিজেদেরকে তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ হতে দিচ্ছে।
আমেরিকা সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র রফতানি করে। প্রয়োজনের সরকার বদলে ফেলে। কিন্তু এই বিশাল ফিলিস্তিন সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি উদার গণতন্ত্র, নাগরিক স্বাধীনতা,পরমত সহিষ্ণুতা আমেরিকা বিক্রি করে শুধু নিজের স্বার্থে।
আমেরিকার মদদে ইসরায়েল একটি সবল রাষ্ট্র এবং সে নিজেই সন্ত্রাসী হয়ে উঠে নিরস্ত্র অসহায় নিরপরাধ মানুষের নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছে। এর চেয়ে ঘৃণ্যতর কাজ আর কী হতে পারে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যতম নিকৃষ্ট এই 'ওয়ার ক্রাইম' বা যুদ্ধাপরাধকে 'চূড়ান্ত অন্যায়' বলা ছাড়া আর কোন পথ কি থাকতে পারে গণতন্ত্রবিশ্বাসী উদারবাদীদের পক্ষে? কেন এক হামাসকে শিক্ষা দেওয়ার নামে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের উপর নেমে আসবে ইসরায়েলের মৃত্যুবোমা? কেন গাজায় পানি,বিদ্যুৎ,যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে? কেন হাসপাতালে অসুস্থ অথর্ব শিশু যুবা বৃদ্ধদের ছিন্নভিন্ন করা হবে? কী বলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের নিয়মনীতি? সন্ত্রাসীরা নিরপরাধ আবালবৃদ্ধবনিতাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করছে আর বিশ্ববাসী নিরবে তা দেখছে। মাঝে মাঝে এসব নাগরিক প্রতিবাদ করে কি থামানো যাবে বর্বর জয়ের উল্লাসে মত্ত ইসরায়েলকে?
বাংলাদেশ আজ প্রতিবাদমুখর। দল মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষ ফিলিস্তিনিদের উপর এই ইসরায়েলি অত্যাচার বন্ধ চায়। তারা প্রতিবাদ করছে। কিন্তু ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলের অবর্ণনীয় নৃশংসতার সামনে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিধর আরব দেশগুলো নিরব। বাংলাদেশের ক্ষমতা নেই। কিন্তু সৌদি আরব বা তুরস্কের পক্ষে যা করা সম্ভব, তারা তা করছে না। ওআইসি ও আরব মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
বাংলাদেশে আজ লাখো মানুষ রাজপথে। সারা পৃথিবীতেই। কিন্তু জানা নেই এর মাধ্যমে কোন নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে কিনা। মুসলিম বিশ্ব শুধু নয়, জাতিসংঘসহ মানবিক বিশ্ব যদি আজ ঐক্যবদ্ধ না হয় তাহলে এসব মিটিং-মিছিলে গাজার মৃত্যুপথযাত্রী শিশুটির ক্ষুধা মিটবে না, ঘরহারা মানুষটির জন্য এক বোতল পানিও জুটবে না।
Comments