নারী চিকিৎসকের অবহেলাজনিত মৃত্যু: স্বামী ও শ্বশুরসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা নামে এক তরুণ নারী চিকিৎসকের অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন, ২০২৬) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে এই আবেদন করেন বাদী মো. মশিউর রহমান শাহ। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ প্রদানের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার আবেদনে নিহতের স্বামী-শ্বশুরসহ চারজন এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। নামোল্লেখিত আসামিরা হলেন: স্বামী: ডা. রহমত রশীদ। শ্বশুর: ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ (বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিয়াক বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল)। শাশুড়ি: সিদ্দিকা সুলতানা। অন্যান্য: 'ইয়ার্কি' সম্পাদক সিমু নাসের
মামলার অভিযোগ ও পারিবারিক নির্যাতন
মামলার আরজিতে বলা হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনার সময় সহপাঠী ডা. রহমত রশীদের সঙ্গে ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে বর্তমানে দুই বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
অভিযোগে বাদীর পক্ষ থেকে যেসকল দাবি করা হয়েছে, ডা. ধীপ্রা অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল পরিবার থেকে আসায় বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। এর ফলে তিনি তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। সন্তান প্রসবের পর তিনি 'পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন', উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। আসামিরা নিজেরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও ডা. ধীপ্রার চিকিৎসার খরচ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন এবং তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেও অন্যায়ভাবে বাধা দেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ডা. ধীপ্রা 'Female Doctors in Bangladesh' নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে নিজের ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা পোস্ট করেছিলেন।
মামলার আবেদনে গত জুনের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি নির্মম ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গত ২ জুন থেকে টানা তিন দিন আসামিরা ডা. ধীপ্রাকে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এ সময় তাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং তার দুই বছরের সন্তানকেও তার কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ জুন খবর পেয়ে ডা. ধীপ্রার মা ধানমন্ডির 'বসতী গ্রীন' আবাসন এলাকার ৪/এ রোডের ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। মায়ের অনুরোধে স্বামী রুমের তালা খুলে দিলে ডা. ধীপ্রা ঘর থেকে বের হয়েই তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, "মা, আমি ভাত খাব।" এ কথা বলার পরপরই তিনি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর ডা. ধীপ্রাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে না নিয়ে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করেন। পরবর্তীতে শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদের প্রভাব খাটিয়ে চিকিৎসার নামে অনেক দূরবর্তী বারডেম হাসপাতালে নেওয়ার পথে ডা. ধীপ্রার মৃত্যু হয়।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, মৃত্যুর পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে আসামিরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করান এবং দ্রুত দাফন সম্পন্ন করেন। বাদীর দাবি—এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধের আলামত ধ্বংসের চেষ্টা।
Comments