ইরানের ৩১ প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভ ইরানের নতুন নতুন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভের ১৩তম দিনে এটি ৩১টি প্রদেশে ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। দেশজুড়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। শঙ্কা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হস্তক্ষেপেরও। এ অবস্থায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে কাজ করলে ছাড় দেওয়া হবে না।
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইরানে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ইন্টারনেট স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানায়, কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথমে পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহ শহরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর জানায় নেটব্লকস। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন বাড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানায়, ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী কমপক্ষে ৪৫ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে।
এমন এক সময় এ বিক্ষোভের তীব্রতা বেড়েছে, যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লেবানন সফর করছেন। বৃহস্পতিবার সেখানে তিনি দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। প্রেসটিভি অনলাইন জানায়, বৈঠকে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ধারাবাহিক উত্তেজনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সাতটি কুর্দি রাজনৈতিক দলের ডাকে সাধারণ ধর্মঘট পালন করেন দোকানিরা। তারা কুর্দি অঞ্চল ও ইরানের কয়েক ডজন শহরে দোকান বন্ধ রাখেন। হেঙ্গাও অধিকার গোষ্ঠী পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইলম, কেরমানশাহ ও লোরেস্তানে বন্ধ দোকানের ফুটেজ পোস্ট করেছেন। কর্তৃপক্ষকে কেরমানশাহ ও উত্তরে নিকটবর্তী শহর কামিয়ারানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির অভিযোগ করেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হন। বিক্ষোভ হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আবাদানেও। আইএইচআর জানিয়েছে, গত বুধবার ছিল ১৩ দিনের আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। এদিন অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। আইএইচআর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোঘাদ্দাম বলেন, দমনপীড়নের পরিধি প্রতিদিন আরও বিস্তৃত ও সহিংস হচ্ছে। এতে শতাধিক আহত ও দুই হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি প্রাণ গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও। বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, গত বুধবার তেহরানের পশ্চিমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। গত মঙ্গলবার এক দল দুর্বৃত্ত ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টদের খুঁজছে ইরানের কর্তৃপক্ষ।
তিন বছরের মধ্যে এটি ইরানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। এর আগে ২০২২ সালে নারী স্বাধীনতা নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভ করার ক্ষেত্রে সংযমের আহ্বান জানান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যে কোনো সহিংস বা জবরদস্তিমূলক আচরণ এড়ানো উচিত। পাশাপাশি তিনি 'জনগণের দাবি শোনার' জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
মুদ্রার মানে ব্যাপক পতন, অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সম্প্রতি এ বিক্ষোভ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অবরোধের কারণে ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত বছর থেকে খাদ্যের গড় দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
জাতীয় ঐক্যের ডাক খামেনির
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দেশজুড়ে চলমান গণবিক্ষোভের মুখে 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের' বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত ভাষণে খামেনি বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, কর্তৃপক্ষ বিদেশি শত্রুদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্ত হিসেবে এ বিক্ষোভকে চিহ্নিত করেছে। অস্থিরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ এনে খামেনি বলেন, দাঙ্গাবাজরা সরকারি সম্পত্তিতে আক্রমণ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরান 'বিদেশিদের ভাড়াটে' হিসেবে কাজ করা লোকদের সহ্য করবে না। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন– তাদের হাত ইরানিদের 'রক্তে রঞ্জিত'।
Comments