এআইয়ের যুগে পিআর: শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত?
সংকট অথবা গ্রাহকের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে এই সময়ে প্রতিষ্ঠানকে অন্তত দুইটি চ্যালেঞ্জ একসাথে মোকাবিলা করতে হয়। একদিকে গ্রাহকের অভিযোগ সমাধানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো, অন্যদিকে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা।
সংকট কাটিয়ে উঠতে শুধু ভালো লেখার দক্ষতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্য যাচাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা। পাশাপাশি সংকটকালীন যোগাযোগের পরিকল্পনা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
বদলে যাচ্ছে জনসংযোগের কাজ
বর্তমান সময়ে জনসংযোগ পেশাজীবীদের কাজ শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা নয়। অথবা প্রোগ্রাম আয়োজন বা মিডিয়া কর্মীদের সাথে যোগাযোগের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গ মানুষের সম্পর্ক তৈরির ধরন বদলে দিয়েছে। ফলে পিআর নিয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান কি বর্তমান কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট?
একসময় জনসংযোগের প্রধান কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানের বার্তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, ভুল তথ্য শনাক্ত করা এবং সংকটের সময় দ্রুত ও দায়িত্বশীলভাবে বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এআই দিয়ে কনটেন্টের খসড়া তৈরি, গ্রাহকের মন্তব্য বিশ্লেষণ, সাধারণ প্রশ্ন শনাক্ত এবং যোগাযোগের ফলাফল মূল্যায়ন করা যায়। কিন্তু এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে পেশাজীবীদের জানতে হবে কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোন ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন এবং কোথায় মানুষের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।
অর্থাৎ, ডিজিটাল যুগে একজন জনসংযোগ পেশাজীবীর দক্ষতা শুধু লেখার মান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রযুক্তি বোঝা, তথ্য বিশ্লেষণ, কৌশলগত চিন্তা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের জনসংযোগ ও যোগাযোগ শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। সেটি হলো, শিক্ষার্থীরা কি শ্রেণিকক্ষের জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, ব্যবহারিক কোর্স, ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশা বিশ্লেষণ করা দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে জনসংযোগের তত্ত্ব, যোগাযোগ কৌশল ও গণমাধ্যম সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। তবে এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল কনটেন্ট পরিকল্পনা বিষয়ে জ্ঞাণ রাখতে হবে। এছাড়াও এআই ব্যবহারের নৈতিকতা এবং সংকটকালীন যোগাযোগের বাস্তব অনুশীলনও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীকে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগাযোগ কৌশল তৈরি করতে বলা হলো। এখানে শুধু একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা দিয়ে সেই কাজ শেষ হয় না। তাকে গ্রাহক যাচাই, সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন, সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত, প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করতে হয়। আরেকটি দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে। সেটি হলো, পরিকল্পনার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে জানা। এসব দক্ষতা অর্জনের জন্য শ্রেণিকক্ষের আলোচনা ছাড়াও বাস্তব পরিস্থিতির অনুশীলন প্রয়োজন।
এআইয়ের ব্যবহার, কিন্তু দায়িত্ব কার?
এআইয়ের কারণে পিআর শিক্ষার্থীদের শেখার গতি বেড়েছে। তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। বর্তমান সময়ে কনটেন্ট লেখা বড় কোন স্কিল নয়। এখন মূখ্য হয়েছে, একজন শিক্ষার্থী অথবা পেশাজীবি কত ভালো ফ্যাক্ট চেকার হতে পারে। কেননা এআই এমন অনেক তথ্য দিতে পারে যা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পিআর পেশাজীবিদের জন্য ভাষার আঞ্চলিক ব্যবহার, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এআইয়ের আধুনিক ব্যবহার শেখা কঠিন কিছু নয়। তাই শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে তথ্য যাচাই, তথ্য সুরক্ষা, কপিরাইট এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগের বিষয়গুলো।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে বাস্তবধর্মী অনুশীলনের মাধ্যমে এসব দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে। যেমন, একটি কাল্পনিক ব্র্যান্ডসংকট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা করতে দেওয়া যেতে পারে। পরে এআইয়ের সাহায্যে তৈরি খসড়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বিশ্লেষণের তুলনা করে ভুল, পক্ষপাত ও নৈতিক ঝুঁকি চিহ্নিত করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের যৌথ দায়িত্ব
ডিজিটাল যুগের দক্ষতা তৈরির দায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। শিক্ষার্থীদেরও পাঠ্যক্রমের বাইরে গবেষণা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং বাস্তব প্রকল্পে অংশ নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কর্মক্ষেত্রের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময় থাকলে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোথায় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে এবং পাঠ্যক্রমে কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের ফলাফল পরিমাপ ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
সামনের দিনে জনসংযোগ শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার ওপরও। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুইটি কাজ করতে পারে। প্রথমত শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান বাড়ানো। দ্বিতীয়ত ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিচারবোধ তৈরি করা। এই দুই কাজে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ ছাড়াও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পেশার জন্যও নিজেদের প্রস্তুত করছেন।
Comments