বরিশালের স্থানীয় নদ নদী থেকে কেন কমছে রূপালী ইলিশ?

বরিশালের স্থানীয় নদ নদী থেকে প্রতি বছরই কমছে ইলিশ আহরণ। ভরা মৌসুমে সমুদ্রে কিছু ইলিশ ধরা পড়লেও তা পর্যাপ্ত না। যাতে করে অর্থনীতিতেও পরছে প্রভাব। কেনই বা কমছে রূপালী ইলিশ। কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন মধ্যবিত্ত মানুষেরই রুপালি ইলিশ কিনে খাওয়া দায় হয়ে গেছে। অনেকেই এই মাছের স্বাদই ভুলতে বসেছেন। গরিব তো দূরের কথা মধ্যবিত্তদেরও ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ইলিশের দাম।
বাজার করতে আসা বেসরকারী চাকুরী জিবী মনির হোসেন বাজার ঘুরে ইলিশের দাম শুনে মাছ কেনর উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলেন বজারের যে পরিস্থিতি তাতে আমাদের মত মানুষের এখন আর ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভন না। ইলিশ আল্লাহর নেয়ামত নদীতে উৎপাদন হয় যাত কোন খরচ নেই সেই মাছ কিনে খাওয়া যাচ্ছেনা অধিক দামের কারনে। ইলিশের যে স্বাদ আগামীতে সাধারন মানুষ ভূলেই যাবে।
মৎস অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২২ – ২৩ অর্থ বছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থ বছর পর্যন্ত ইলিশ কমেছে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিকটন। যার প্রভাব পড়েছে বাজারগুলোতে।
বরিশাল বিভাগে :
২০২২ – ২৩ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো–৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। ২০২৩ – ২৪ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো – ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ মেট্রিক টন। ২০২৪ – ২৫ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো – ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন।
বরিশাল জেলায় :
২০২২ – ২৩ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো – ৩৯ হাজার ৪৭১ মেট্রিক টন। ২০২৩ – ২৪ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো – ৪০ হাজার ৪৭৩ মেট্রিক টন। ২০২৪ – ২৫ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিলো – ৪২ হাজার ১৫৩ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বাজারে ৭০০ – ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম – ৮৫ থেকে ৯০ হাজার ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম – ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা মন বিক্রি হচ্ছে।
মৎস ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুমেও বরিশালের মোকামগুলোতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ। অল্প পরিমাণে মাছ বাজারে পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। বরিশালের সবচাইতে বড় মোকাম নগরীর পোর্ট রোড মৎস্য আড়তে কয়েক বছর ধরে ইলিশের সংকট দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন ১৫০-২০০ মণ ইলিশ আমদানি হতো, সেখানে এখন মাত্র ৫০ মণে নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত ইলিশ না মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
তিনি বলেন, ব্যবসার এমন অবস্থা ধার দেনা করেও চলা দায় হয়ে যাচ্ছে। সারাবছর এই সময় (মৌসুম) অপেক্ষায় থাকি ইলিশের আমদানি হবে। কিন্তু সাগরের পাশাপাশি নদীর মাছও কমেগেছে।
মৎস আড়ৎদার ইয়ার উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নানা ব্যবস্থা গ্রহন করে সরকার। কিন্তু বাস্তবে তার কোন সুফল মিলছে না ।
জখনই নদীতে ইলিশ প্রজনন শেষ হয়। তারপর থেকে সেই মাছগুলোকে ছেকে উঠিয়ে ফেলা হয়। বাজারে চাপিলা বলে চালিয়ে দেয়। এই মাছ গুলো বড় হলে নদীতে ইলিশের আকাল থাকত না তাদের।
নদীর ইলিশ রক্ষ্যা ও সরবরাহ বাড়াতে সরকারের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা ও মনিটরিং চলমান রয়েছে বলে জানান বরিশাল বিভাগীয় মৎস অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম আকন্দ । তবে নাব্যতা সংকটে নদীর মোহনা গুলোতে চর পড়ে যাওয়ায় সাগর থেকে মিঠা পানিতে ইলিশ আসা কমে গেছে বলে ধারনা মৎস্য অধিদপ্তরের।
আগামীর কথা চিন্তা করে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কোস্টাল স্টাডিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, ঝাটকা নিধন একেবারেই বন্ধ করতে হবে। কারেন্ট জালের ক্ষেত্রে যে আইন আছে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে হেব। নদী দখল, নদী দূষন ফ্রেস ওয়াটার ইকো সিস্টেমকে রোসোর্স হিসেবে বিবেচনা করে এটাকে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট যে পলিসি সেটাকে ঠিক করে আমরা নদীকে একেবারে নদীর যে পানি প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য যত ধরনের আইনের প্রয়োগ আছে সেটাকে সরকারের করতে হবে। তাহেই শুধু ইলিশ সহ অণ্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
সারাদেশের ইলিশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন হয় বরিশাল বিভাগে।
Comments