আমেরিকার ক্ষমতার লাগাম টানবে বিরোধীরা, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন বলে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে পরিস্থিতি কার্যকর হবে।
ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে কোন কোন ক্ষেত্রে, সেগুলো একটু আলোচনা করা যাক—
আইন প্রণয়নে বড় বাধা আসবে
ট্রাম্পের নতুন আইন, করনীতি, অভিবাসননীতি কিংবা অর্থনৈতিক সংস্কার অনুমোদন করানো কঠিন হবে। ডেমোক্র্যাটরা বিল আটকে দিতে পারবেন। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আইন পরিবর্তন বা বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারবেন। বাজেট ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দর-কষাকষি করতে পারবেন। কংগ্রেসের সমর্থন ছাড়া ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে কি?
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাবেন। তারা যেসব তদন্ত করতে পারবেন: ট্রাম্পের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, প্রশাসনের দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ, অভিবাসন বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। কমিটি কর্মকর্তাদের তলব করতে, শুনানি করতে এবং নথি দাবি করতে পারবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে নিয়মিত রাজনৈতিক ও আইনি চাপের মুখে থাকতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে যেতে পারে
সিনেটের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদন। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায়: মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ বিলম্বিত করতে পারবেন। বিচারপতি ও ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টে কোনো শূন্য পদ সৃষ্টি হলে ট্রাম্পের পছন্দের বিচারপতি নিয়োগ কঠিন হতে পারে। এটি ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রভাব তৈরির পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করবে।
ইমপিচমেন্ট বা আস্থার ঝুঁকি বাড়বে
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: প্রতিনিধি পরিষদে ইমপিচমেন্ট অনুমোদন করা সম্ভব। কিন্তু সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া তাঁকে পদ থেকে সরানো যাবে না। ডেমোক্র্যাটদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ট্রাম্পকে অপসারণ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, ইমপিচমেন্টের রাজনৈতিক চাপ বাড়বে, কিন্তু পদচ্যুতির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
বাজেট ও সরকারি কার্যক্রম নিয়ে সংঘাত
কংগ্রেসের হাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের পছন্দের সামরিক ব্যয়, সীমান্তনীতি কিংবা অন্যান্য প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে পারেন। বাজেট নিয়ে মতবিরোধ বাড়লে: সরকারি কার্যক্রম বন্ধ বা আংশিক বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। ঋণসীমা নিয়ে সংঘাত হতে পারে। প্রশাসনকে বিভিন্ন বিষয়ে আপস করতে হতে পারে।
ইরান, ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক নীতিতে চাপ
ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতি সরাসরি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখবেন। তবে ডেমোক্র্যাটরা সামরিক ব্যয় ও যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে চাপ দিতে পারবেন। এমনকি ইরান যুদ্ধ নিয়ে শুনানি করতে পারবেন। ইউক্রেন ও রাশিয়া নীতি নিয়ে প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখে ফেলতে পারবেন। নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে আইনগত বাধা তৈরি করতে পারবেন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ব্যয় ও জ্বালানি মূল্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়তে পারে।
ট্রাম্প কি পুরোপুরি ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বেন?
না। প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো থাকবে নির্বাহী আদেশ জারির ক্ষমতা, পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিতে নেতৃত্ব, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ক্ষমতা, আইন ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা, প্রশাসনিক সংস্থাগুলো পরিচালনার ক্ষমতা। কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করা যায় না। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্পের অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
এই ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই পরাজয় ট্রাম্পের জন্য শুধু কংগ্রেস হারানো নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর বড় আঘাত। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দলের ভেতরে নেতৃত্ব, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্সি থাকবে, কিন্তু কংগ্রেস তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ফলে আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রণয়নের চেয়ে তদন্ত, রাজনৈতিক সংঘাত, বাজেট নিয়ে দর-কষাকষি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে অনেকেই লেম ডাক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডাকতে শুরু করেছে।
Comments