সাম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: লক্ষ্য ব্যয় সংকোচন,বাস্তবে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা
পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সাম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা,পরিচালন ব্যয় কমানো,সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এক্সিম ব্যাংক,ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে এক ছাতার নিচে এনে নতুন ব্যাংক গঠনের মধ্য দিয়ে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই ব্যাংকটির জনবল ব্যবস্থাপনা,নিয়োগনীতি,বেতনবৈষম্য,শাখা পুনর্বিন্যাস এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো,প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৭৬১টি শাখা নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটিতে ব্যয় সংকোচনের পরিবর্তে নতুন করে লোকবল নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। অথচ পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার অন্যতম যুক্তি ছিল বিদ্যমান জনবল ও শাখা নেটওয়ার্ককে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো। প্রয়োজনীয় জনবল থাকার পরও যদি যথাযথ নিয়োগনীতি,অনুমোদিত পদকাঠামো ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়,তাহলে একীভূতকরণের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বেতনবৈষম্য ও পদোন্নতি জটিলতা বড় অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এক হলেও তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় রয়ে গেছে বড় ধরনের পার্থক্য। একই পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের বেতনে ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যবধান থাকাটা কোনোভাবেই একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সমন্বিত অর্গানোগ্রাম ও অভিন্ন বেতনকাঠামোর পরিকল্পনা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
অবশ্য বেতনবৈষম্য দূর করাও সহজ কাজ নয়। কারণ,যারা বর্তমানে তুলনামূলক বেশি বেতন পাচ্ছেন,তাদের বেতন কমানো হলে নতুন অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আবার কম বেতন পাওয়া কর্মীদের দীর্ঘদিনের বৈষম্যও উপেক্ষা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয়, অভিন্ন বেতন স্কেল এবং দায়িত্ব ও যোগ্যতাভিত্তিক পদোন্নতি নীতি কার্যকর করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো।
শাখা পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। মতিঝিল,কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় পাঁচটি ব্যাংকের একাধিক শাখা একই ভবনে কিংবা কাছাকাছি দূরত্বে পরিচালিত হয়েছে। একীভূত হওয়ার পর এসব শাখার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূত,স্থানান্তর বা পুনর্বিন্যাস করার কথা। একই সঙ্গে উদ্বৃত্ত জনবলকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুসারে কাজে লাগানো সম্ভব। এতে একদিকে পরিচালন ব্যয় কমবে,অন্যদিকে ব্যাংকের সেবার পরিধিও বাড়বে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাব থাকলে একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যয় বহাল থেকে যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতকারীদের স্বার্থ। ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর সাধারণ গ্রাহকদের প্রত্যাশা ছিল,তারা দ্রুত ও নির্বিঘ্নে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাবেন। কিন্তু অনেক আমানতকারী এখনও অর্থ উত্তোলনে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেয়াদি আমানতের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও অর্থ ফেরত পেতে বিলম্ব,এমনকি কোথাও কোথাও অর্জিত মুনাফা বাদ দিয়ে শুধু মূল টাকা উত্তোলনের শর্ত দেওয়ার বিষয়গুলো গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে,ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার মূলধন বা শাখা নেটওয়ার্ক নয়;বরং আমানতকারীদের আস্থা। সেই আস্থা নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
সাম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। এ মুহূর্তে নতুন নিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান জনবলের দক্ষতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ বন্ধ,অভিন্ন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন,শাখা নেটওয়ার্ক পুনর্বিন্যাস,পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একটি বিষয় স্পষ্ট-পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করলেই একটি শক্তিশালী ব্যাংক তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা,স্বচ্ছ নিয়োগনীতি,সুশাসন,জবাবদিহি এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, একীভূতকরণের সাফল্য নতুন নিয়োগ বা বড় সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়;বরং কতটা ব্যয় কমানো গেল,কতটা দক্ষতা বাড়ল এবং কত দ্রুত আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা গেল,তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা।
সুতরাং এখনই প্রয়োজন সমন্বিত ও সময়াবদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনা। অন্যথায় যে লক্ষ্য সামনে রেখে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছিল,তা অর্জনের পরিবর্তে নতুন ব্যাংকটি পুরোনো সমস্যার সঙ্গে নতুন প্রশাসনিক জটিলতার বোঝা বহন করতে বাধ্য হবে।
Comments