অভিযান চলে, থামে না মাদক
বাংলাদেশের মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না পরিস্থিতি। বরং নতুন নতুন মাদকের বিস্তার, তরুণদের আসক্তি এবং সংঘবদ্ধ পাচার চক্রের সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে।
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ মাদকাসক্ত, এমন হিসাব বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের ২০২৫ সালের জাতীয় গবেষণায় দেশে প্রায় ৮২ লাখ মাদক ব্যবহারকারীর তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ইয়াবা ব্যবহারকারী প্রায় ২৩ লাখ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কোনো না কোনো অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। এরপর রয়েছে ইয়াবা, হিরোইন ও অন্যান্য মাদক।
কেন বাড়ছে মাদকের বিস্তার? গবেষণায় মাদক ব্যবহারের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা ও মানসিক চাপ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁরা সহজেই মাদক সংগ্রহ করতে পারেন। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় ৯২ শতাংশ ব্যবহারকারী ২৫ বছর বয়সের আগেই প্রথম মাদক গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক গ্রহণের পেছনে ব্যক্তিগত কৌতূহলের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখছে। কর্মসংস্থানের অভাব, হতাশা এবং মাদকের সহজলভ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
প্রতিদিন কোটি টাকার ইয়াবার চাহিদা ইয়াবার বাজারের আকারও উদ্বেগজনক। গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ২২ লাখ ৯৩ হাজার ইয়াবা ব্যবহারকারী রয়েছেন। প্রত্যেকে দৈনিক গড়ে তিন থেকে পাঁচটি ইয়াবা সেবন করলে প্রতিদিন সম্ভাব্য চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৬৯ লাখ থেকে ১ কোটি ১৪ লাখ বড়ি।
বাংলাদেশে ইয়াবার অন্যতম প্রধান উৎস মিয়ানমার। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ভারতের সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকও আসছে। পাচারকারীরা নদীপথ, উপকূলীয় এলাকা এবং বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে।
মাদক কারবারে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামে পুলিশ সদস্যদের ইয়াবা পাচার ও জব্দ করা মাদক আত্মসাতের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছয়টি আলাদা ঘটনায় ইয়াবাসহ ছয় পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া জব্দ করা মাদক আত্মসাতের অভিযোগে ১৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করার তথ্যও উঠে আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু পাচারকারী চক্র চেকপোস্ট পার হতে পুলিশ সদস্যদের কমিশন দেয়। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হওয়া জরুরি। পুরো বাহিনীকে এর দায়ে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই।
মামলা হচ্ছে, ধরা পড়ছে না মূল হোতারা? মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২৬ জেলার ৫০০টি মাদক মামলার রায় বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ২৯৬টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ ৫৯ শতাংশ মামলায় অভিযোগ প্রমাণ হয়নি।
তদন্তে দুর্বলতা, জব্দ তালিকায় অসংগতি, সাক্ষীর অভাব এবং তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ার মতো বিষয় মামলাগুলোকে দুর্বল করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, মাদকসহ গ্রেপ্তার হওয়া বাহক বা খুচরা বিক্রেতার বাইরে অর্থদাতা ও মূল হোতাদের শনাক্ত করার নজির ছিল সীমিত।
চিকিৎসার বাইরে অধিকাংশ মাদক সমস্যার আরেকটি বড় দিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাব। বিএমইউর গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের মাত্র ১৩ শতাংশ কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা পেয়েছেন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।
গবেষণায় মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, কাউন্সেলিং এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
সম্প্রতি এক টেলিভিশন আলোচনায় এ নিয়ে বক্তারা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ, পাচার চক্রের অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি এবং দুর্বল মামলার তদন্তব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
Comments