বিনিয়োগের কোন ক্ষুধাই নেই ব্যবসায়ীদের
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন, বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করছেন এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ব্যাংকগুলোও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.১৭ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, এতটা মন্দা তাঁরা স্মরণ করতে পারছেন না। তাঁদের মতে, অন্তত ১৯৯৩ সালের পর ঋণ প্রবৃদ্ধি এতটা দুর্বল অবস্থায় আর দেখা যায়নি। সর্বশেষ এই প্রবৃদ্ধি ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬.৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক কম।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির দুরবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে ঋণ বিতরণের এই স্থবিরতায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ঋণের চাহিদা কম থাকার পেছনে বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক ভিত্তি দায়ী।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, "এই তারল্যের বণ্টন এখনো অসম। তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও দুর্বল কিছু ব্যাংক এখনো তহবিল ও তারল্যসংকটে ভুগছে।"
ঋণ প্রবৃদ্ধির এই মন্থরতা মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা বিরাজ করছে এবং পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮.৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৮.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বরং বেড়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে আসার যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তা উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বড় কোনো বিনিয়োগ প্রকল্পও পাইপলাইনে নেই। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) ক্রমবর্ধমান বোঝার কারণে অনেক ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ।
বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রার মান ও কল্যাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উচ্চ ঋণের সুদহার, অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহের উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত মুনাফা পাওয়ার বিষয়ে আস্থার অভাব—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে সতর্ক হয়ে পড়েছেন।
অনেক প্রতিষ্ঠানই নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা পরিচালনা এবং ঋণের বোঝা সামাল দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ নেবে না। কারণ, ব্যবসায়ীরা যদি পর্যাপ্ত চাহিদা এবং স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবেশ না দেখেন, তাহলে তাঁরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না।
Comments