৩০ হাজার টাকা মজুরি চান পোশাকশ্রমিকরা, এই টাকায় কি চলবে সংসার?
পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বেতনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, পোশাক কারখানার মালিকদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে কম দাম পাওয়ার কারণে একসঙ্গে বড় অঙ্কের মজুরি বাড়ানো কঠিন। ফলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের সক্ষমতা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। ১ নভেম্বর বোর্ড গঠনের ঘোষণা আসে। ২ নভেম্বর থেকে কারখানাগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরলেও নতুন করে অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।
কেন ৩০ হাজার টাকা মজুরি চান শ্রমিকরা?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। তখন শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। নতুন মজুরি কার্যকর হয় ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে।
তবে মজুরি বাড়লেও গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে বলে মনে করছেন শ্রমিক সংগঠন ও অর্থনীতিবিদেরা।
শ্রমিকদের বক্তব্য, একজন শ্রমিককে শুধু নিজের খাবার নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খরচও বহন করতে হয়। মাস শেষে বাসাভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, সন্তানের পড়াশোনা এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে হাতে তেমন অর্থ থাকে না।
ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রমিক সংগঠন গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির হিসাবে, ২০১৮ সালে যে পণ্য ও সেবা কিনতে ৮ হাজার টাকা প্রয়োজন হতো, বর্তমানে সেগুলোর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, পোশাকশ্রমিকদের জন্য ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছে। শ্রমিকদের যুক্তি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
একজন পোশাক শ্রমিকের সংসার চালাতে কত টাকা লাগে?
একজন পোশাক শ্রমিকের পরিবারের মাসিক ব্যয় কত, তার সাম্প্রতিক ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
অ্যাঙ্কার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে চার সদস্যের একটি পরিবারের মৌলিক কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য ঢাকায় মাসে ৪৮ হাজার ২২ টাকা এবং ঢাকার আশপাশের স্যাটেলাইট শহরগুলোতে ৩৯ হাজার ৭৬২ টাকা প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে।
এই গবেষণায় জীবনযাপনযোগ্য মজুরি বলতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্ভাব্য আয় বিবেচনায় নিয়ে একজন কর্মীর প্রয়োজনীয় মজুরি বোঝানো হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১২ হাজার ৫০০ টাকা একজন শ্রমিকের মোট প্রারম্ভিক মজুরি। অন্যদিকে, গবেষণায় দেখানো ৪৮ হাজার ২২ টাকা বা ৩৯ হাজার ৭৬২ টাকা চার সদস্যের পরিবারের সামগ্রিক ব্যয়। তাই দুটি হিসাবকে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না।
ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের চাপ
পোশাকশিল্পের বড় অংশের শ্রমিক বসবাস করেন ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও আশপাশের এলাকায়। এসব জায়গায় বাসাভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি প্রায় সব এলাকার শ্রমিকদের জন্যই বড় চাপ তৈরি করেছে।
অ্যাঙ্কার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় ঢাকা শহর এবং আশপাশের স্যাটেলাইট শহরের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য পাওয়া যায়। তবে গাজীপুর ও সাভারের জন্য আলাদা বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের হালনাগাদ নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ওই গবেষণায় নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিডিপলিসি ল্যাব জানিয়েছে, ঢাকা বিভাগের শহরাঞ্চলের পোশাকশ্রমিক পরিবারের মোট ব্যয়ের ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশই চলে যায় খাবারের পেছনে। ওই গবেষণায় পোশাকশ্রমিক পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় পাওয়া গেছে ৩০ হাজার ৮৬৬ টাকা। তবে এটি ২০২২ সালের তথ্য, বর্তমান বাজারদর নয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পোশাকশ্রমিক পরিবারের ৫০ শতাংশ এক কক্ষের বাসায় বসবাস করতেন। ৬৪ শতাংশ পরিবার অন্য পরিবারের সঙ্গে শৌচাগার ভাগাভাগি করতেন।
অর্থাৎ, ব্যয় কমাতে অনেক শ্রমিক পরিবারকে আবাসন ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে হয়।
ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের বর্তমান ব্যয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ তুলনা করতে হলে স্থানীয় বাজারদর, বাড়িভাড়া এবং শ্রমিক পরিবারের নিজস্ব হিসাব নিয়ে নতুন মাঠপর্যায়ের জরিপ প্রয়োজন।
মালিকপক্ষের বক্তব্য: ৩০ হাজার টাকা দেওয়া কতটা সম্ভব?
শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি থাকলেও পোশাকশিল্পের মালিকদের সামনে রয়েছে উৎপাদন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার চাপ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় শ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে ৩০ হাজার টাকা দাবির ভিত্তি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
২ নভেম্বর আরেকটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে কারখানাগুলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে ৯ শতাংশ হারে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে পোশাকের দাম ও চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, শ্রমিকরা কাজে ফিরে না এলে আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মালিকেরা।
১ নভেম্বর শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে বিজিএমইএ।
কবে সিদ্ধান্ত দেবে মজুরি বোর্ড?
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ১ নভেম্বর ২০২৬ ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আগে নিয়োগ পাওয়া শেখ আশফাকুর রহমানের সঙ্গে পাঁচজন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বোর্ডে রয়েছেন— স্বতন্ত্র সদস্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি: বিজিএমইএ-এর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি: বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করতে বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের মজুরির প্রশ্নটি শুধু একটি শিল্পের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা—দুটিই জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন মজুরি নির্ধারণে শুধু মালিক বা শ্রমিকের দাবি নয়, বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের প্রকৃত মূল্য বিবেচনা করতে হবে। কারণ, যে শিল্প দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখছে, সেই শিল্পের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, নতুন মজুরি বোর্ড সেই ভারসাম্য কতটা নিশ্চিত করতে পারে।
Comments