ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ, পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে গভীর শঙ্কা
ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের পদ্মা নামে পরিচিত গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীমাতৃক এই অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭২ বছর বয়সী বাসিন্দা বিকাশ সোরেন জানান, একসময় ভারত থেকে আসা এই নদীতে সারাবছর বড় বড় নৌকা চলত, অথচ এখন বছরের প্রায় তিন মাস নদীর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। পানির অভাবে গত মৌসুমে ফসল নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় দুই কৃষকের আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে।
একইভাবে আগে নদী থেকে প্রচুর মাছ ধরলেও এখন পানিশূন্যতার কারণে মৎস্যজীবীরা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। নদী গবেষকদের মতে, গড়াই নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সুন্দরবনে মিঠাপানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট লবণাক্ততা ঠেকাতেও গড়াইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। পানির অভাবে দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কার্যক্ষমতাও মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা নদী বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অববাহিকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ৬৫ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে, যার মধ্যে ৫ কোটি মানুষই বাংলাদেশের। ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ দেনদরবারের পর ১৯৯৬ সালে সই হওয়া বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। তবে এই চুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ চুক্তি নবায়নের জন্য আলোচনার আহ্বান জানালেও ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাতে সাড়া দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নদী-সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তবে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে গত কয়েক বছরে উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিত হয়নি।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান বলেন, ভারতের উজানে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। তাই নতুন চুক্তিতে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পুরো নদী অববাহিকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'রিভারাইন পিপল'-এর মহাসচিব শেখ রোকন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চুক্তি না থাকলে পরিস্থিতি অতীতে চুক্তিহীন সময়ের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নেবে, কারণ বর্তমানে উভয় দেশেই মিঠাপানির চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে বাংলাদেশ সরকার ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি কার্যকর পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা অত্যন্ত জরুরি।
Comments