মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশ্ববাজারে ১১৫ ডলার ছাড়াল তেলের দাম
সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় টানা চতুর্থ মাসের মতো তেলের দাম বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ডব্লিউটিআইয়ের দামও ১০২ ডলারের ওপরে উঠেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ২২ মিনিটে ব্রেন্ট তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তির দাম ৮৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ১১৫ ডলার ৭৪ সেন্টে পৌঁছায়। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৭২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ৭২ সেন্ট হয়।
অক্টোবর মাসে ব্রেন্টের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। জুলাইয়ের পর এক মাসে এটিই হতে পারে দুই ধরনের তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি।
বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। ওই দিন ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে রাস তানুরা ও রাবিগ তেল শোধনাগার এবং আবকাইক এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা।
এদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, দেশটির পশ্চিমাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির প্রধান গবেষক শৌল কাভোনিক বলেন, হরমুজ প্রণালির আশপাশে সামরিক হামলা অব্যাহত থাকায় এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা অনিশ্চিত হওয়ায় তেলের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সংঘাত বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরুর উদ্যোগ থাকলেও তা বাজারের উদ্বেগ কমাতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানান, ইরানকে চিকিৎসাসামগ্রী পেতে সহায়তার বিষয়ে দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ হিসেবে ভ্যান্স ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান চিঠিটি পেয়েছে। তবে এখনো কোনো জবাব দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মেনে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইরান। তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অবস্থান তারা গ্রহণ করবে না।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, প্রণালির দক্ষিণে অনুমোদনহীন একটি পথ ব্যবহারের সময় তিনটি তেলবাহী জাহাজ সমুদ্রের মাইনে আঘাত করে। এতে জাহাজগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনছে। রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এক্সনমোবিল ও শেভরন আগামী সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠেয় দেশটির বৃহত্তম তেলবিষয়ক প্রদর্শনীতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে।
এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখছেন ব্যবসায়ীরা। সংঘাতের কারণে তেল উৎপাদন ও পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে দাম আরও বাড়তে পারে।
Comments