শীতের আগেই বাড়ছে পাহাড়ে পানির শঙ্কা, শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি
পাহাড়ে বৃষ্টি হয় প্রচুর, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির তীব্র সংকট। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বহু পাহাড়ি পরিবারের জন্য নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহ এখনো প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। বন উজাড়, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, প্রাকৃতিক জলধারা শুকিয়ে যাওয়া এবং পানির উৎসের ওপর বাড়তি চাপ সব মিলিয়ে সংকটটি আরও জটিল হচ্ছে। নতুন গবেষণা ও সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ছুটে যান খাগড়াছড়ি, সাজেক, রাঙামাটি বা বান্দরবানে। সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ আর ঝিরির প্রবাহ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কিন্তু পাহাড়ের এমন মনোরম দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। অনেক এলাকার বাসিন্দাকে প্রতিদিন দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। কোথাও ঝিরি শুকিয়ে যায়, কোথাও কূপে পানি থাকে না, আবার কোথাও পানি পাওয়া গেলেও তা পান করার উপযোগী থাকে না।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ ঘুরে দেখলেও এই ভূপ্রকৃতির বৈপরীত্য সহজেই চোখে পড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়, অথচ শুষ্ক সময়ে সেই পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকলে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০২৬ সালের ৬ জুন প্রকাশিত Discover Sustainability সাময়িকীর একটি গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পানি, স্যানিটেশন, জীবিকা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটির শিরোনাম Circular economy and nature-based solutions for WASH resilience in Bangladesh's Hill tracts।
গবেষণায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চারটি প্রত্যন্ত গ্রাম, চাকবাছড়া, বেতছড়ি, পাখিজাছড়ি ও দীঘিনালা কেন্দ্র করে পানি সংগ্রহ, স্যানিটেশন, জীবিকা এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণার উল্লেখযোগ্য ফলাফল হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ পরিবার মৌসুমি পানির সংকটে আক্রান্ত। শুষ্ক মৌসুমে ৭২ শতাংশ পরিবার উচ্চমাত্রার বা চরম পানির সংকটের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবারকে পানি সংগ্রহের সময়, দূরত্ব ও স্যানিটেশন-সংক্রান্ত একাধিক সমস্যার কারণে উচ্চমাত্রার ভোগান্তির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির ঝিরিগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পাহাড়ি অঞ্চলে ঝিরি, ছড়া, ঝরনা ও প্রাকৃতিক প্রস্রবণ শুধুমাত্র প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়; এগুলো অনেক পরিবারের দৈনন্দিন পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমতলের মতো বিস্তৃত পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা প্রত্যন্ত এলাকায় সহজে গড়ে তোলা যায় না। পাহাড়ের পাথুরে ভূপ্রকৃতিও অনেক জায়গায় গভীর নলকূপ স্থাপনকে কঠিন করে তোলে।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত Mongabay-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা এলাকার পিট্টাছড়া বনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রাকৃতিক ঝিরি সচল রাখতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ছোট জলাধার তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য বর্ষায় জমা হওয়া পানি ধীরে ধীরে মাটিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে ঝিরির প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করা।
প্রতিবেদনটিতে চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জন্য সিইজিআইএসের ২০২৪ সালের একটি জলসম্পদ জরিপের ফলও উল্লেখ করা হয়। ওই জরিপ অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির যেসব ঝিরি কয়েক দশক আগেও সারা বছর প্রবাহিত হতো, সেগুলোর ১৫ শতাংশ গ্রীষ্মকালে সম্পূর্ণ শুকিয়ে ছিল। রাঙামাটিতে ২২ শতাংশ এবং বান্দরবানে ২০ শতাংশ ঝিরি মৌসুমি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
শীত ও শুষ্ক মৌসুমে সংকট কেন বাড়ে?
পাহাড়ে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও তার বড় অংশ ঢাল বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে যায়। মাটির ভেতরে পানি ধরে রাখার সুযোগ কমে গেলে এবং প্রাকৃতিক জলধারার উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্ষার পানি পরবর্তী মাসগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে Hydrology সাময়িকীতে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-উপরিস্থ পানি, ভূগর্ভস্থ পানি ও বৃষ্টির পানির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় এ সমস্যার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে খাড়া ঢাল, জটিল ভূতাত্ত্বিক গঠন, দ্রুত পানি প্রবাহ এবং পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণব্যবস্থার অভাব টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার পথে বড় বাধা।
গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, বর্ষায় পানির প্রাচুর্য থাকলেই শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া নিশ্চিত হয় না। বরং বৃষ্টির পানি কতটা মাটিতে প্রবেশ করছে, কতটা ভূগর্ভে সঞ্চিত থাকছে এবং কতটা ঝিরি-ছড়ায় প্রবাহিত হচ্ছে এসব বিষয় পানির প্রাপ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
বন উজাড়, পাহাড়ের ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং কিছু এলাকায় বাণিজ্যিক বাগান ও পর্যটনকেন্দ্রের বাড়তি পানির চাহিদাও সংকটের সঙ্গে যুক্ত। তবে সব এলাকার সমস্যার কারণ এক নয়।
সাম্প্রতিক সংবাদেও উঠে এসেছে পানির সংকট
২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে রাঙামাটির দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের পানির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ও দূরের উৎসে যাওয়ার দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়। রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি জয়েন্ট ফার্ম এলাকায় ৫০টিরও বেশি পরিবার একটি ছোট ঝিরি থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঝিরিটি শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের পানি সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেখানে পাঁচ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করলেও বাসিন্দারা সেটিকে পর্যাপ্ত মনে করেননি।
এর আগে ২০২৬ সালের ১৫ জুন প্রকাশিত আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা এলাকার আলুটিলা পাহাড়ের বাসিন্দাদের পানির কষ্ট তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাত সদস্যের পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করতে কুসুমলতা ত্রিপুরাকে প্রতিদিন সকালে অন্তত তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো এবং দিনে একাধিকবার পানি সংগ্রহে যেতে হতো।
একই প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির প্রায় ৪০ শতাংশ বাসিন্দা শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে পড়েন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পানির সংকট কেবল পান করার পানির অভাব নয়। পানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় শিশুদের পড়াশোনা, নারীদের দৈনন্দিন কাজ, পরিবারের আয় এবং কৃষিকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারীদের ওপর বেশি পড়লে এই সংকটের সামাজিক প্রভাবও অসমভাবে বণ্টিত হয়।
পর্যটনের বিকাশ, কিন্তু স্থানীয়দের পানির নিশ্চয়তা কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে। পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করলেও পানির উৎসের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
অনুসন্ধানে বান্দরবানের কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে সাবমার্সিবল পাম্প ও পাইপের মাধ্যমে পানি তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে একটি পাহাড়ি পরিবারের দৈনিক আনুমানিক ৪০ লিটার পানির ব্যবহারের বিপরীতে একটি রিসোর্টে প্রায় ৪০০ লিটার পানি ব্যবহারের তুলনাও তুলে ধরা হয়।
এই তুলনাকে সব পরিবার ও সব রিসোর্টের জন্য প্রযোজ্য গড় হিসেবে দেখা যাবে না। তবে এটি পানির ব্যবহার ও প্রাপ্যতার বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
পর্যটন উন্নয়ন ও স্থানীয় মানুষের পানির অধিকারকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। বরং নতুন পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের আগে পানির উৎসের ধারণক্ষমতা যাচাই, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন পর্যবেক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সমাধান কী হতে পারে?
পাহাড়ের পানিসংকট মোকাবিলায় শুধু নলকূপ স্থাপন বা সাময়িকভাবে পানির ট্যাংকার পাঠানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পানির উৎসের ধরন বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
প্রথমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: বর্ষায় ছাদ ও উপযুক্ত স্থানে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে বড় ট্যাংক বা কমিউনিটি জলাধারে রাখা যেতে পারে। তবে পানযোগ্য ব্যবহারের আগে প্রয়োজনীয় পরিশোধন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঝিরি ও বনাঞ্চল রক্ষা: প্রাকৃতিক ঝিরির উৎস, পাহাড়ের বন এবং পানি ধারণে সহায়ক উদ্ভিদ সংরক্ষণ জরুরি। দেশীয় প্রজাতির গাছ ফিরিয়ে আনা এবং পানির উৎসের আশপাশে ভূমির ক্ষয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, স্থানীয় ভূপ্রকৃতির উপযোগী পানি সরবরাহব্যবস্থা: সব পাহাড়ে গভীর নলকূপ কার্যকর হবে না। কোথাও কমিউনিটি ট্যাংক, কোথাও গ্র্যাভিটি-ফ্লো ব্যবস্থা, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ছোট জলাধারের সমন্বিত ব্যবস্থা বেশি কার্যকর হতে পারে।
চতুর্থত, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ: কোন ঝিরি কখন শুকিয়ে যায়, কোথায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে, কত পরিবার নিরাপদ পানি পাচ্ছে না এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলো কত পানি ব্যবহার করছে এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: পানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় পাহাড়ের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পানি সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এখনই উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও বাড়তে পারে
পার্বত্য চট্টগ্রামের পানিসংকটের সমাধান খুঁজতে একদিকে যেমন নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন, অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন প্রাকৃতিক জলধারা সংরক্ষণ এবং পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। বর্ষার বিপুল পানি ধরে রাখতে না পারলে শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি নিয়ে সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
খাগড়াছড়ির পাহাড়, ঝিরি ও বনভূমি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব অঞ্চলকে পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
Comments