বাদাম বিক্রেতা থেকে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের মসনদে- কে এই লুলা?
দরিদ্র পরিবারের সন্তান থেকে শুরু করে শ্রমিক আন্দোলন, কারাবাস পেরিয়ে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন এক অনন্য রূপকথার মতো। বিশ্বজুড়ে যিনি কেবল 'লুলা' নামেই সমধিক পরিচিত, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শত প্রতিকূলতা জয় করে তিনি আজ বিশ্ব রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৪৫ সালে ব্রাজিলের এক অত্যন্ত দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া লুলার শৈশব কেটেছে চরম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ছোটবেলায় তাকে রাস্তায় বাদাম ও কমলা বিক্রি করতে হয়েছে। চরম দারিদ্র্যের কারণে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বা অক্ষরজ্ঞান হয়নি তার। কৈশোরে পেট চালাতে কারখানায় ধাতব শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬০-এর দশকে কারখানায় কাজ করার সময় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তার একটি আঙুল কেটে যায়, যা তার সংগ্রামী জীবনের আরেকটি কঠিন ধাক্কা ছিল।
শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক উত্থান
লুলার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল মূলত অধিকার আদায়ের লড়াকু শ্রমিক আন্দোলনের হাত ধরে। ১৯৭৫ সালে তিনি ধাতু শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান নির্বাচিত হন। এরপর শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'ওয়ার্কার্স পার্টি' (PT), যা পরবর্তীতে ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
তবে ব্রাজিলের রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানো লুলার জন্য সহজ ছিল না। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথের লড়াই ও একাধিকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর, ২০০২ সালে প্রথমবার দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ক্ষমতায় এসে তিনি দেশের বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা বদলানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে 'বোলসা ফ্যামিলিয়া' (Bolsa Família)-র মতো যুগান্তকারী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেন, যা কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়।
কারাবাস থেকে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
লুলার রাজনৈতিক যাত্রায় বড় বিপর্যয় নেমে আসে ২০১৮ সালে। বহুল আলোচিত 'অপারেশন কার ওয়াশ' দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের জেরে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাবন্দি করা হয়। টানা ১৮ মাসের বেশি সময় তাকে কারাগারে কাটাতে হয়, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
তবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তার বিরুদ্ধে আনীত দণ্ড ও সাজা বাতিল করা হয়। আইনি জটিলতা কেটে যাওয়ার পর তিনি ফের রাজনীতিতে সগৌরবে ফিরে আসেন এবং ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃতীয়বারের মতো দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন।
রেকর্ড গড়ে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতার মসনদে
সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে আবারও এক অভাবনীয় ইতিহাস গড়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থী নেতা।
নির্বাচনের প্রথম ধাপে তুলনামূলক কম ভোট পেয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণে বিশ্লেষকরা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কারণ ব্রাজিলের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম ধাপে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয় ধাপে বা রান-অফে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার এমন কোনো নজির অতীতে ছিল না। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে ৫১.৭৯% (৬ কোটি ৪২ লাখের বেশি) ভোট পেয়ে বিজয়ী হন লুলা। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পান ৪৮.২১% (৫ কোটি ৯০ লাখের বেশি) ভোট।
এই নাটকীয় জয়ের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতিতে বামপন্থীদের আধিপত্য যেমন সুসংহত হলো, তেমনি ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করলেন সংগ্রামী জননেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
সূত্র: বিবিসি
Comments