কংক্রিটের শহরে ঋতুবদল: তাপ আর ধুলোয় হাঁসফাঁস ঢাকাবাসী
অক্টোবর মাস শেষের দিকে। ক্যালেন্ডারে শীতের আগমনী বার্তা, অথচ ঢাকা শহরে রোদের তেজে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাই দায়। ভোরে বাতাসজুড়ে ধোঁয়াশা, সঙ্গে ধুলা আর যানবাহনের ধোঁয়া। ঢাকা শহরে ঋতু বদলায় ঠিকই, কিন্তু নগরবাসীর জীবনে স্বস্তি আসে না। প্রকৃতির নিয়মে অক্টোবর-নভেম্বরে শরৎ পেরিয়ে আসে হেমন্ত। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতা কমে, বৃষ্টি কমে আসে আর ভোরের দিকে নামে হালকা শীতের আমেজ। গ্রামের দিকে হেমন্ত ঋতু মানে ভোরে শিশিরভেজা ঘাস ও শিউলি ঝরানো মিষ্টি আমেজ নিয়ে চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া।
কিন্তু ঢাকায় দেখা যাচ্ছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। দিনে প্রখর রোদের তাপ আর ভোরে ঘোলাটে দূষিত বাতাস—সব মিলিয়ে স্বস্তিতে নেই নগরবাসী। তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও গরম ও ঠান্ডার সংমিশ্রণে শিশু থেকে বয়স্ক—অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন সর্দি-জ্বরসহ নানা ঋতুভিত্তিক অসুখে।
চলতি মাসের ৬ তারিখে বৈশ্বিক বায়ুমান সূচক বা 'লাইভ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স' অনুযায়ী, ২১৭ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় এক নম্বরে উঠে আসে ঢাকা। পরিবেশবিদদের মতে, শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই ধূলিকণা ও যানবাহনের ধোঁয়া বেড়ে যাওয়ায় বায়ুমানের এই চরম অবনতি ঘটেছে।
সবুজ কমেছে, তাপ বেড়েছে
গ্রীষ্মের চরম দাবদাহ আর শীতের ধূলিদূষণের কারনে ঢাকা আসলে এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি—যার নাম 'আরবান হিট আইল্যান্ড' বা 'নগর তাপদ্বীপ'। শহরের কংক্রিট, পিচ আর ইট-সুরকির বড় বড় দালান দিনভর সূর্যের তাপ শুষে নেয় এবং রাতে তা পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। ভূপৃষ্ঠ কংক্রিটে ঢেকে থাকায় পানি বাষ্পীভূত হয়ে বাতাস ঠান্ডা হওয়ার সুযোগও পায় না। ফলে দেশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় রাজধানী পরিণত হয় এক উত্তপ্ত দ্বীপে।
ঢাকার এই উষ্ণায়নের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
গাছপালার সংকট: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ৫৬ শতাংশ গাছপালা কমেছে। বর্তমানে শহরের মাত্র ৮ শতাংশ এলাকা বৃক্ষ-আচ্ছাদিত।
গা ঘেঁষাঘেষি ভবন: গাছপালা ও জলাভূমি বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি বায়ুপ্রবাহের পথ রুদ্ধ হওয়ায় শহরের ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে পারে না।
মানুষের সৃষ্ট বর্জ্য তাপ: অপরিকল্পিত যানবাহন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র (এসি) থেকে নির্গত বর্জ্য তাপ শহরকে আরও উত্তপ্ত করছে। বিশেষজ্ঞেদের ভাষ্যে, গরম থেকে বাঁচতে মানুষ একদিকে এসি চালাচ্ছেন, আর অন্যদিকে সেই এসিই বাইরের তাপ বাড়িয়ে শহরকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
গবেষণাভেদে হিসাবের তারতম্য থাকলেও সব উপাত্তই নির্দেশ করছে একই বিপদের কথা। 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার দশকে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত গাছপালা ও জলাভূমির অভাবে ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকার তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি বেশি থাকে।
অন্যদিকে, একটি অপ্রকাশিত গবেষণার দাবি, এল নিনোর প্রভাবে রাজধানীর তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পদ্ধতি ও অঞ্চলভেদে এসব উপাত্তের ভিন্নতা থাকলেও স্যাটেলাইট চিত্রনির্ভর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ অংশই এখন 'হিট আইল্যান্ড' বা উষ্ণ দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
ঋতুবদলের কারণে দূষণের তীব্রতা
অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বাতাস ধুয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না, আবার বাতাসের গতিও থাকে ধীর। ফলে ধুলা ও ধোঁয়া ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আটকে থাকে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণের তিন প্রধান উৎস: ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজের ধুলা।
বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, নভেম্বর থেকে মার্চ—এই পাঁচ মাসেই বছরের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বায়ুদূষণ ঘটে। গত বছরের চিত্রও ছিল একইভাবে উদ্বেগজনক। ১২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৫৪ দিনের মধ্যে মাত্র ১২ দিন ঢাকার বায়ুমান সূচক ১৫০-এর নিচে ছিল। অর্থাৎ, ঋতুবদলের এই সময়টাই আসলে মারাত্মক দূষণ মৌসুমের প্রস্তুতি পর্ব।
স্বাস্থ্যঝুঁকি
অসহনীয় তাপ আর বিষাক্ত দূষণের কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশু, বয়স্ক, হাঁপানি ও হৃদরোগী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। সেই সঙ্গে চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন খোলা আকাশের নিচে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ—রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ফুটপাতের বিক্রেতা ও ট্রাফিক পুলিশ। উল্লেখ্য, বায়ুমান সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে 'খুব অস্বাস্থ্যকর' ধরা হয়, আর এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ ও রোগীদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নাগরিক সচেতনতায় করণীয়:
- বাইরে বের হলে বিশেষ করে ভোরে ও সন্ধ্যায় মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করা।
- প্রচুর পানি পান করা এবং দুপুরের কড়া রোদে অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকা।
- বাসা-বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় গাছ লাগানো। ছাদে হালকা রঙের বা প্রতিফলনকারী প্রলেপ দিলে ভবনের অভ্যন্তরীণ তাপ কমে।
- বায়ুমান সূচক দেখে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নির্ধারণ করা।
নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে করণীয়:
- নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনে খোলা জায়গা, বায়ু চলাচলের পথ ও সবুজ অংশ(গাছপালা) রাখার শর্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
- বিদ্যমান পার্ক, খেলার মাঠ ও জলাশয় রক্ষা করা এবং নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা।
- নির্মাণকাজ এলাকায় পানি ছিটানো ও ধূলা ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করা।
- ইটভাটা ও পুরোনো যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি চালানো।
- অতিরিক্ত তাপপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ ও 'কুলিং জোন' তৈরি করা।
ঋতুবদল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, কিন্তু ঢাকায় সেই প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি সংকট। একদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ সেই তাপকে ঘরের ভেতর আটকে রাখছে। এসবের খেসারত দিতে হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ও শ্রমজীবী নগরবাসীদের। তাই ঢাকা শহরে সবুজ গাছপালা, জলাশয় আর খোলা জায়গা ফিরিয়ে আনা এখন আর কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ও ঢাকার বাসবাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার প্রধান শর্ত।
Comments